1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
  3. Khulnabureaudesh@gmail.com : Khulna bureau : Khulna bureau
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০, ০৪:১০ পূর্বাহ্ন

অল্প স্বল্প গল্পঃ ভয়ংকর একটি দিন

হিফজুর রহমান
  • আপডেট টাইম :: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০

(আজ ২য় পর্ব)


১.

১৯৯৭ সালের জানুয়ারী মাস। আমি তখন অস্ট্রেলীয় দূতাবাসে কাজ করছি পলিটিক্যাল/ইকনমিক অফিসার হিসেবে। চাকুরীসূত্রে অনেকই দায়িত্ব ছিল আমার। বলা যায় অনেকটা কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করতাম এবং কূটনৈতিক সুবিধাও ভোগ করতাম। তাতে বন্ধু যেমন বেড়েছিল,  শত্রুরও কোনও অভাব ছিলনা, কেবলই ইর্ষার কারণে। এবার কাজের কথায় আসি।


২.

৫ জানুয়ারী ১৯৯৭, রোববার (এই তারিখের কৃতিত্ব, ফিকসনের) সকাল। আটটায় অফিস শুরু। আমার গাড়ি অফিসে পৌঁছে দিয়ে বাসায় চলে যেত। আবার বিকেলে এসে নিয়ে যেত অফিস থেকে। দিনের বাকি সময় অফিসের কাজ সারতাম, নিসান প্যাট্রল বা টয়োটা ল্যান্ডক্রুজারে করে। কাজে প্রচন্ড ব্যস্ত, দুপুর বারোটায় যেতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, আমেরিকাস ও প্যাসিফক ডেস্কের পরিচালক শহিদ ভাইয়ের (সাম্প্রতিক অতীতের পররাষ্ট্র সচিব) সাথে মিটিং ছিল। সাড়ে ন’টায় রিসেপশন থেকে ফোন এল, হিফজুর ভাই ডিজিএফআই থেকে একজন অফিসার এসেছেন, আপনার সাথে দেখা করতে। আমার আরেকটি দায়িত্ব ছিল, ডিফেন্স লিয়াইজন। এই কারণে ডিজিএফআই-এর ফরেন লিয়াইজন বিভাগের সাথে যোগাযোগ করতে হত প্রতিনিয়তই। তাই খুব একটা অবাক না হয়ে নিচে নেমে গেলাম। লবিতে একজন যুবা কর্মকর্তা, অবশ্যই সিভিল ড্রেসে, অপেক্ষা করছিলেন। অরেকজন দীর্ঘকায় লোক তার পাশেই দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘মেজর সাদেক (নামটা সম্ভবত ঠিকই আছে), ফ্রম স্পেশাল অপারেশন্স। এবার অবাক হলাম, কারণ আমার সাথে স্পেশাল অপারেশন্স এর তো কোন কাজ নেই! মেজর বলল, ‘স্যার আপনার সাথে পরিচয় করতে এলাম।’ তারপর লম্বা লোকটাকে দেখিয়ে বলল, ‘ও আমাদের একজন ফিল্ড অফিসার। আপনার সাথে মাঝে মধ্যেই দেখা হবে। ও বাইরেই থাকবে।’ বলে, মেজর সাদেক বিদায় নিয়ে চলে গেল। একটু চিন্তিত হয়েই দোতলায় উঠতে লাগলাম। এসময় রিসেপশন্সিট ললি বলল, ‘হিফজুর ভাই, এনএসআই থেকে সাদাত সাহেব ফোন করেছেন।’

আমি বললাম, ‘আমার অফিসে লাইনটা দিয়ে দেন।’ দ্রুতই হেঁটে চলে গেলাম অফিসে। ফোন তুলতেই সাদাত ভাই (এনএসআই এর ডেপুটি ডিরেক্টর, পরে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি হয়ে অবসর নিয়েছিলেন) বললেন, হিফজুর ভাই একটু আমাদের অফিসে আসতে পারবেন? জরুরী দরকার।’

আমি বললাম, ‘আজকেই, সাদাত ভাই?’ তিনি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিতে আমি বললাম, দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাব। তখন যেতে পারি আপনার ওখানে।’ উনি জানালেন ১১টায় ওঁদের অফিসে যেতে। বারোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিটিং। ওঁদের অফিস হয়ে যেতে পারব সেখানে।

৩.

সেগুনবাগিচায় এনএসআই অফিসের সামনে হলুদ নাম্বার প্লেটের গাড়ি থামতেই অপেক্ষমাণ একজন এগিয়ে এলেন। আমি নামতেই বললেন, ‘স্যার, ওপরে ডিডি স্যার আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’ বলে তিনি তিন তলার পাস ধরিয়ে দিলেন। তিনতলায় উঠে দেখলাম, সাদাত ভাই তাঁর রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। এমনটা সাধারণত হত না। কারণ আমি প্রায় নিয়মিতই তাঁদের অফিসে যেতাম, কখনও অফিসের কাজে, কখনও এমনিই। সাদাত ভাই আমাকে নিয়ে ঘরে ঢুকেই একটা সিঙ্গেল সোফার দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে বসতে বললেন। আমি তাঁর অফিসে গেলে সাধারণত তার ডেস্কের সামনেই চেয়ারে বসতাম। আবার একটু অবাক হলাম। কিন্তু, কিছু বললাম না। সাদাত ভাই বসলেন না, পায়চারি করতে লাগলেন আমার সামনে। একটু পরই দরজায় টোকা। সাদাত ভাই দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলেই বললেন, ‘আসেন, স্যার।’ দু’জন ঘরে ঢুকলেন। প্রথম জন একটু দীর্ঘকায়। হাত বাড়িয়ে দিলেন, আমার দিকে। আমিও দাঁড়িয়ে করমর্দন করলাম। সাদাত ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন, ডিডিজি (উপ-মহাপরিচালক, এনএসআই, একজন কর্ণেল-নাম বললাম না)। তার পরের জনও অত্যন্ত বিনয়ের সাথে হাত এগিয়ে দিলেন, আমি তাঁরও করমর্দন করলাম। পরিচয় পেলাম, পরিচালক (ফরেন অ্যাফেয়ার্স) মাসুদ আহমেদ (ডিআইজি হিসেবে অবসর নিয়েছিলেন)। ওঁরা দুজন বড় সোফাটায় বসলেন। আমি আমারটায়, সাদাত ভাই বসলেন না। তাঁকে একটু অস্থির দেখাচ্ছিল। এবার আমাকেও অস্থিরতা গ্রাস করল, অবশ্য তার কোনও বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দিলাম না।

মাসুদ সাহেব সাদাত ভাইকে বললেন, ‘কি সাদাত, চা নাশতা দেন নি রহমান সাহেবকে?’ চটজলদি জবাব সাদাত ভাইয়ের, এখনই দেব, স্যার। এবার মাসুদ সাহেব আমাকে বললেন, ‘হিফজুর সাহেব, আপনার কথা অনেক শুনেছি, সাদাতের কাছে। কেমন লাগছে, অস্ট্রেলীয় দতাবাসের চাকুরী?’ এরই মধ্যে স্যান্ডউইচ এল, কফি সহ।

আমি বললাম, ‘খুব ভালো। আরামে আছি।’

এবার কর্ণেল জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেতন সব নিয়ে সুখী আপনি? কোনও অসুবিধে নেই তো?”

আমি বললাম, ‘মোটেও না। বাংলাদেশে বসে সৎপথে এতটাকা আয় করা সম্ভব নয় মোটেও। তাছাড়া আমি ঈর্ষনীয় সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করি, সেটাও আশা করিনি কোনওদিন।’

এরপর স্যান্ডউইচ খেতে খেতে আরও কিছু প্রশ্ন এল, আমিও সেগুলোর  উত্তর দিলাম। প্রশ্নগুলোর মূল উদ্দেশ্যই ছিল, আমি আর্থিকভাবে এবং সামাজিক ভাবে ভালো আছি কি না, সেটা জানা। তারপর একসময় ওঁরা নিজেরা বিদায় নিলেন এই কথা বলে, আবার দেখা হবে। সাদাত ভাইও আমাকে বিদায় জানালেন। আমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ের সময়ও হয়ে গেছে ততক্ষণে। অবশ্য, এনএসআই অফিস থেকে সেখানে যেতে খুব বেশি হলে পাঁচ মিনিট লাগবে।

৪.

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিটিং সেরে অফিসে ঢুকতেই আবার ললি বলল, ‘হিফজুর ভাই, সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ থেকে রাজু সাহেব ফোন করেছিলেন। আপনি এলেই ফোন করতে বলেছেন, জরুরী দরকার।’ রাজু আহমেদ আমার ছোট ভইয়ের মত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিল, আমার অনেকই জুনিয়র।

‘আমার অফিসে লাইন দেন,’ বলেই কোটটা খুলতে খুলতে অফিসে ঢুকতেই ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরে শুনলাম রাজুর কন্ঠ, ‘বাবুল ভাই (আমার ডাক নাম), একটু আমাদের অফিসে আসতে হয় যে! খুব জরুরী দরকার।’ ততক্ষণে আমার মাথায় ঘন্টা বেজে উঠেছে। সকালে ডিজিএফআই, দুপুরে এনএসআই আর এখন এসবি, ঘটনা কি?

আমি বললাম, ‘রাজু, এখন তো পারব না। অফিস ছুটির পর প্রোব-এ যাব সেখানে একটু কাজ সেরে আসতে পারি। ধর, সন্ধ্যে সাতটায়!’

‘ঠিক আছে, বাবুল ভাই আসেন। আমরা আপনার জন্যে অপেক্ষা করব।’ বলে রাজু রেখে দিল। আমি প্রোব ম্যাগাজিনে সপ্তাহে দু’দিন যেতাম ঘন্টা দুয়েকের জন্য, সম্পাদনার পার্ট টাইম কাজে। রোববার আর বুধবার। প্রোব-এর সম্পাদক ইরতিজা নাসিম আলীর অনুরোধে কাজটা করতে বাধ্য হয়েছিলাম।

অফিস ছুটি হত, বিকেল তিনটা একান্ন মিনিটে। ছুটির আগে বেরোবার প্রস্তুতি নিচ্ছি, কোট পরা, টাই ঠিক করা আর ব্যাগ গুছোনো, এই সব কাজ আর কি! এই সময়ে আমাদের একজন ড্রাইভার জামান এল আমার অফিসে। ওর চোখেমুখে আতংক। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে আমাকে বলতে লাগল, ‘স্যার, রাজ্যের ইন্টেলিজেন্সের লোক আমাগো অফিস ঘিরি রাইখছে। আপনের গাড়িও। মটর সাইকেল লই অপেক্ষা কইরতেছে।’ একটু ধাক্কা লাগল বুকে। ঘটনা কি? আতংক আমাকেও গ্রাস করতে লাগল। তারপরও জামানকে প্রবোধ জানালাম এই বলে যে, ওই সব কিছুনা, জামান। ঘাবড়াইয়েন না।

ব্যাগ হাতে করে নিচে নামলাম। গেট থেকে বেরিয়েই দেখলাম, মোটামুটি ছোটখাট একটা ভিড় আমার গাড়ি আর হাইকমিশনের সামনে। গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভার আরব আলী বলল, ‘স্যার, বাসা না প্রোব?’ আরব আলী আমার প্রাত্যহিক রুটিন জানত। ওকে প্রোব-এ যেতে বলে একটা ম্যাগাজিনে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলাম। আরব আলী গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রওনা হতে হতে বলল, ‘স্যার, কয়েকজন মটর সাইকেলে ফলো করতাছে।’ আমি ওকে যেতে বলে, চিন্তায় ডুবে পড়লাম। সমস্যা কি? প্রোবে গিয়ে ইরতিজাকে বললাম দিনের সব ঘটনা। ইরতিজা খোঁজ নিয়ে জানল, ওদের অফিসের সামনের গেটে অন্তত আটজন মটর সাইকেল আরোহী অপেক্ষা করছে।

এবার ইরতিজা ফোন করল রাজুকে। ওর সাথেও রাজুর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। রাজুর সাথে কথা বলতে বলতে ইরতিজা দু’বার বলল, “মাই গড, মাই গড!” তারপর ফোন রেখে আমাকে বলল, ‘হিফজুর ভাই, ঘটনা মারাত্মক। সরকার রেড অ্যালার্ট ইস্যু করেছে আপনার বিরুদ্ধে। রিপোর্ট আছে, আপনি নাকি একটা মার্সেনারী গ্রুপের নেতা এবং আপনার গ্রুপের মিশন হচ্ছে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়াকে হত্যা করা।’ দেব গৌড়া তারপর দিনই অর্থ্যাৎ ৬ জানুয়ারী দুই দিনের সফরে বাংলাদেশে আসছেন। এবার ঘাবড়ে গেলাম রীতিমত। আর রক্ষা নেই বোধহয়! ইরতিজাকে জিজ্ঞেস করলাম, সাবের ভাইকে (তখন উপমন্ত্রী এবং ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি) ফোন করে এসব জানাব কি না। ইরতিজা বলল, এখনই না। আগে আমাকে এসবি  অফিসে যেতে বলল, সব বোঝার জন্য। সেও কিছু খোঁজ-খবর করবে। তথাস্তু করে আবার দিয়ে গাড়িতে উঠলাম। আরব আলীকে বললাম, বেইলি রোডে সিটি এসবি অফিসে যেতে। এবার সামনে দুটো মটর সাইকেলে চারজন এবং পিছনে দুটো মটর সাইকেলে চারজন। প্রায় এ্সকর্ট করে নিয়ে চলল, আমাদের। বেইলি রোডে এসবি অফিসে পৌঁছুতেই আমাকে নিয়ে যাওয়া হল, এএসপি আতাহার সাহেবের রুমে। ওখানে রাজুও বসে ছিল।

৫.

আতাহার সাহেব দিনের অন্যদের মত কালক্ষেপণ করলেন না মোটেও। অনেক প্রশ্ন করতে লাগলেন। তার মধ্যে একটা কমন প্রশ্ন ছিল, কোনও আজমকে আমি চিনি কি না, আমার কোনও শত্রু আছে কি না। আমি বললাম, একজন আজমকে চিনি, সাংবাদিকতার সুবাদে। ও দৈনিক সংগ্রামের সিনিয়র প্রতিবেদক। আর আমার কোনও শত্রু আছে বলে আমি জানিনা। এই ভাবে রাত প্রায় ন’টা বেজে গেল। অবশ্য, এরই মধ্যে আতাহার সাহেব আমার ড্রাইভারকে ছেড়ে দিতে বলেছিলেন, কারণ “ওরা কথা ছড়ায়”, গাড়ি রয়ে গেল এসবি অফিসেই। আর রাজু আমার জন্যে এন্তার খাবার আনাবার পর আমার বাসায় ফোন করে ওর ভাবিকে বলে দিল, আমাকে একটু জরুরী কাজে নিয়ে এসেছে এসবি অফিসে। দেরি হতে পারে, যাতে ঘাবড়ে না যায়। বুঝলাম, দীর্ঘ সময়ের জন্যেই বোধহয় আটকে গেলাম।

এক সময় আতাহার সাহেবের রুমের দরজা খুলে গেল, ঢুকলেন একজন স্যুট টাই পরা দীর্ঘকায় সুন্দর একজন মানুষ। চমকে উঠলাম। ফিরোজ ভাই (তখন এসবি’র এসএস-১, পলিটিক্যাল-সেটা পরে জেনেছি) দরজায় দাঁড়িয়ে একমুখ হাসি নিয়ে। বললেন, ‘কি বাবুল মিঞা, ঝামেলায় পড়ছ একটা। দেখি কি করা যায়!’ ইমামুল হোসেন ফিরোজ একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, পরিচয় সেই সময় থেকেই। রাজশাহীতে পোস্টেড ছিলেন এএসপি হিসেবে ১৯৭৩ এর পর (পুলিশ থেকে অবসর নেয়ার পর এখন একজন ব্যারিস্টার, হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন)। আতাহার সাহেব ও রাজু দু’জনেই উঠে দাঁড়াল, ফিরোজ ভাইকে দেখে। আতাহার সাহেব ফিরোজ ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার চিনেন নাকি হিফজুর সাহেবকে।’ ফিরোজ ভাই বললেন, ‘ওকে অনেক দিন ধরেই চিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর, ও চাইলে লাখ লাখ টাকা কামাই করতে পারত। ওর এই সততার জন্য আমি ওকে খুব পছন্দ করি।’

ফিরোজ ভাই এর কথা ক’টা আমার ক্যারেক্টার সার্টিফিকেটের মত কাজ করল। ফিরোজ ভাই কি একটা ইশারা করতেই আতাহার সাহেব উঠে বেরিয়ে গেলেন, ফিরোজ ভাইয়ের সঙ্গে। আমি আর রাজু খাবারের অবশিষ্টাংশ শেষ করতে লাগলাম। খিদেও পেয়েছিল অনেক, কারণ আমার ডিনার টাইম ছিল আটটা, সেটা পার হয়ে গেছে অনেক আগেই। রাজু আমার উদ্বেগ কাটাবার চেষ্টা করে যাচ্ছিল নানাভাবে। প্রায় ৪৫ মিনিট পরেই ফিরোজ ভাই আর আতাহার সাহেব এসে ঢুকলেন আমাদের ওখানে। ফিরোজ ভাই বললেন আমাকে, ‘বাবুল মিঞা, অ্যাডিশন্যাল আইজি সাহেবকে পাচ্ছিনা। শেরাটনে রুনা লায়লার গান শুনতে গেছেন। এখন উনার পারমিশন না পেলে তো তোমাকে ছাড়া যাবেনা, ভাই।’ এবার আমার দুশ্চিন্তা তুঙ্গে। আমি বললাম, ‘ফিরোজ ভাই, দুইটা ফোন করতে পারি?’ কাকে ফোন করব জানতে চাইলে জানালাম একটা করব কাদের ভাইকে (ওবায়দুল কাদের), আরেকটা করব সাবের ভাইকে (সাবের হোসেন চৌধুরী)। ফিরোজ ভাই জানালেন, পরে। ওঁরা ব্যর্থ হলে তাদেরকে ফোন করতে পারব। তারপরই ফিরোজ ভাই বললেন, ‘আতাহার সাহেব, চলেন শেরাটনে যাই। বাবুলরে আটকাইলে তো ওর চাকরী চলে যাবে, চক্রান্তও সফল হবে।’ ওঁরা দুজনেই বেরিয়ে গেলেন।

রাজু জানাল, ভয় নাই। স্যারেরা যখন গেছে, তখন একটা ব্যবস্থা হবেই। আরও এক ঘন্টা গেল এই ভাবে। এসবি অফিস তখন শুনসান। রাত সাড়ে দশটা। একটা গাড়ি এসে অফিসের পোর্টিকোতে থামল। দুজনের পায়ের আওয়াজ শোনা দেল, তারপরই দড়াম করে আমাদের দরজা খুলে গেল। ঢুকলেন, দুজনেই, মুখে স্বস্তির হাসি। ফিরোজ ভাই বললেন, ‘বাবুল, যাও বাসায়। এই দফা বাঁচলা।’ জানতে চাইলে, শুধু বললেন, ‘তোমার এইরকম কয়েকটা বন্ধু থাকলে আর শত্রুর দরকার নাই। ওরাই যথেষ্ট, তোমাকে ধ্বংস করার জন্য।’ নামগুলো বললেন না। শুধু বললেন, অ্যাডিশনাল স্যার (এসবি’র প্রধান ছিলেন তখন এওয়াইবিআই সিদ্দিকী, পরে আইজি এবং সচিব পদেও কাজ করেছেন তিনি) বিশ্বাস করলেন যে, তুমি এইরকম ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত থাকার কথা না। তারপরও উনি বললেন, “রিস্ক নেয়ার দরকার নাই। ওনাকে তিন দিনের জন্য আটকে রাখ”। তখন স্যারকে বললাম, এইটা করলেই তো চক্রান্ত সফল। ও চাকুরীটা হারাবে। তারপর, স্যার তোমাকে ছাড়তে রাজি হলেন। তবে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী না যাওয়া পর্যন্ত তোমাকে পাহারায় এবং চোখে চোখে রাখা হবে। এই ক’দিন তৃুমি বাসা আর অফিস করবা। তোমার বাসার আর অফিসের সামনে আমাদের লোক পাহারায় থাকবে। গাড়িকেও ফলো করবে আমাদের লোক।’ একটু থেমে বললেন, ‘এবার যাও বাসায়, বউমা চিন্তায় আছে নিশ্চয়ই। গাড়ি চালাতে পারবা?’

আর দেরি করলাম না। উঠে দাঁড়ালাম, যাবার জন্যে। অদ্ভুত এক মুক্তি! ফিরোজ ভাই আবারও বললেন, ‘আতাহার সাহেব আর রাজুকে একদিন খাইয়ে দিও, ভালো কোনও জায়গায়। ওরা অনেক উপকার করেছে তোমার।’ তারপর একসাথে বেরিয়ে এলাম আমরা। আমার ছাই রংয়ের বড় গাড়িটা একা দাঁড়িয়ে শিশিরে ভিজছে। কোনওরকমে বাসায় এলাম। বাসায় এসেই ইরতিজাকে জানালাম, পুরো ঘটনা। বাকি রাত আর ঘুমোতে পারলাম না। এরকম একটা দিনের পর ঘুমোনো যায়! গিন্নী সফি একটাও প্রশ্ন না করায় স্বস্তি পাচ্ছিলাম। ও আমার চাকুরীর সেনসিটিভিটি সম্পর্কে ভালোই জানত। পরে জেনেছিলাম, আমার বন্ধুরা কারা ছিল, যারা একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে ওই রিপোর্টটা দিয়েছিল। ওদের নাম আর নিচ্ছিনা। এত দিন যখন নিইনি, এখন আর লাভ কি। তবে, বিধাতার মার থেকে ওরা কেউই বাঁচেনি।

 

লেখকঃ গবেষক, লেখক  এবং উন্নয়ন যোগাযোগ কর্মী

 

(চলবে……)

 

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৩:৫৫
    সূর্যোদয়ভোর ৫:২১
    যোহরদুপুর ১২:০৪
    আছরবিকাল ৩:২৫
    মাগরিবসন্ধ্যা ৬:৪৮
    এশা রাত ৮:১৪

@ স্বত্ত দৈনিক দেশ, ২০১৯-২০২০

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ