1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন

অনেক স্মৃতি কি আমরা ভুলে যাই না?

রফী হক
  • আপডেট টাইম :: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২০

রফী হক


আজ প্রবল ঝড় বৃষ্টি হলো দুপুরে । মেঘ কালো করে এলো । ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকলো । এক সময় ঝুপ করে বৃষ্টি নামলো । আমি বড় জানলা বাইরে তাকিয়ে আছি । প্রকৃতির একেকটি দৃশ্যর সঙ্গে কোনো না কোনো স্মৃতি থাকে । সবার জীবনে থাকে কি ? না-কি কারো কারো জীবনেই থাকে ?

১.

আজই গার্সিয়া লোরকার জীবনী পড়ছিলাম । শুরুতেই লোরকা লিখেছেন : ‘যে কারো জীবনই হলো বেঁচে-থাকবার-কালে কী কী ঘটেছে তার-ই বৃত্তান্ত । আমার জীবনে সঞ্চয়ের সমস্তই হলো স্মৃতি । স্মৃতিগুলো একান্তই আমার একার । এত প্রগাঢ় আর গোপনীয় যে, আমি তা বলতেই চাই নি কখনও । কিন্তু তা জীবনভর অবচেতনেই বলে গেছি আমি ।…’

২.
কীভাবে আসে স্মৃতি ? অনেক স্মৃতি কি আমরা ভুলেও যাই না ? কিন্তু প্রকৃতি সবটা ভুলতে দেয় না । বিশেষ বিশেষ পরিবেশে মনের ভেতরে একধরণের ট্রান্সফরমেশন হয় । হতে থাকে । তখন ক্রমশ বদলে যেতে থাকি । সেই সময়গুলোর ভেতর ঢুকে যাই । তার রূপ-রস-গন্ধে বিভোর হই । বেঁচে থাকা এত সুন্দর ! একবার ওয়াহিদ ভাইয়ের সঙ্গে এক রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর বাড়িতে গিয়েছে । দুপুর গড়িয়ে গেছে । হঠাৎ মেঘ কালো করে অন্ধকার হয়ে সন্ধ্যে নেমে এলো । শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদভাইয়ের অপেক্ষাতেই ছিলেন শিল্পী । সামান্য কথা বলে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে গেলেন ।

‘…মেঘের ‘পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে। / আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে। / তুমি যদি না দেখা দাও, কর আমায় হেলা, / কেমন করে কাটে আমার এমন বাদল-বেলা।…’। আমি চোখ বন্ধ করে তাঁর গান শুনছি পাশে বসে । বাইরে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি । এবং আমাকেও বলছেন গলা মেলাতে । ‘…কাজের দিনে নানা কাজে / থাকি নানা লোকের মাঝে, / আজ আমি যে বসে আছি তোমারি আশ্বাসে॥…’ এক ঘোরগ্রস্ত বিকালে আমার মনে হল, এই ঝড়-বৃষ্টি, গাছের পাতা, সবাই গান গাইছে! প্রবল বাতাসে বাইরের গাছগুলো কাঁপছে । কাঁপছি আমি, হত বিহ্বল আমি যেন এক প্রতিমার পাশে বসে রয়েছি । চেয়ে দেখছি তাঁকে ‘…দূরের পানে মেলে আঁখি / কেবল আমি চেয়ে থাকি, / পরান আমার কেঁদে বেড়ায় দুরন্ত বাতাসে॥…’

এই তো গান, এ যেন হৃদয়ের অন্তঃস্থ সঙ্গীত।…’

৩.
আগের লেখায় রুশিয়ার ক্যাম্পিয়ান হ্রদের কথা বলেছিলাম । হ্রদের স্টার্জন মাছের ডিম খেয়েছি লিখেছি সে-কথা । খুব রাশিয়া যাবার ইচ্ছে, যাব – যাব ভেবেও শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি । মস্কোতে সম্ভবত পচানব্বই সালে বাংলাদেশের কন্টেম্পোরারি আর্টের একটি প্রদর্শনী হয়েছিল, নির্বাচিত শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে । কারা ছিলেন শিল্পী নির্বাচন কমিটিতে জানি না । তবে, শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচকমন্ডলীর ওপর কৃতজ্ঞ যে আমি সেই দলে বয়কনিষ্ঠ শিল্পী হিসেবে ছিলাম । সেবার আমার ছবি গিয়েছিল, আমার যাওয়া হয়নি । তবে ওখানকার পত্রিকায় আর বাংলদেশের দৈনিক সংবাদে ঐ প্রদর্শনীর ওপর সুন্দর একটি রিভিউ লিখেছিলেন মস্কো-প্রবাসী বিখ্যাত প্রকৃতিপ্রেমী দ্বিজেন শর্মা । তিনি আমার শিল্পকর্মটির খুব প্রশংসা করেছিলেন । অধ্যাপক ড. হায়াৎ মামুদের কাছ থেকেও মস্কোর গল্প শুনেছি । কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত ভাইও আমায় বলেছেন রুশিয়ার আর্ট মিউজিয়ামগুলোর কথা । এই যে জীবনভর এত মস্কো – মস্কো শুনেছি যে, মস্কোর শিল্পরুচি একবার স্বচোখে দেখতে চাই । কিন্তু পৃথিবী কেমন অনিরাপদ হয়ে গেল, তাই ভাবছি ।

৪.
বহু আগে, দুই হাজার তিন সালে লন্ডন যাওয়ার পথে আমার সঙ্গে তির্থাঙ্কর নামের এক ভারতীয় তরুণের আলাপ হয়েছিল । তরুণটি বাঙালি, দিল্লীতে বড় হয়েছে । দুই বছর রাশিয়া, তিন বছর পশ্চিম জার্মানি আর তিন সাড়ে-তিন বছর ধরে আমেরিকায় আছে । নিউ ইয়র্ক ফ্লোরিডা হয়ে এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় । ভাবভঙ্গি কথাবার্তা সবই সাহেবি । তরুণটি প্লেনের মধ্যে মস্কোর কথা বলতে গিয়ে বলেছিল : ‘ওখানে তো ব্যক্তি স্বাধীনতা বলে কিছু নেই !’

আমি আর কথা বাড়াইনি। ব্যক্তি-স্বাধীনতা কাকে বলে তা আমিই কি জানি ? ক্ষুধার্ত গরীব মানুষদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা থাকে না । শুধু দু-বেলা খেয়ে পরে বেঁচে থাকার চিন্তা থেকেই যারা মুক্ত হতে পারেনি, তারা কোনওরকমেই স্বাধীন নয় । ‘ব্যক্তি-স্বাধীনতা’, ‘মানবাধিকার’, ‘নারী-অধিকার’… এসব আমার কাছে অ্যাবস্ট্রাক্ট মনে হয় । যাক সে অন্য প্রসঙ্গ । একবার মস্কো যেতেই হবে । আমার প্রিয় শিল্পী কান্দিনিস্কির জন্মভুমি ।

৫.
রুশিয়ান শিল্পী ভাসিলি কান্দিনিস্কি প্রথম অ্যাবস্ট্রাক্ট শিল্পকর্মটি করেন ১৯১২ সালে । ‘কম্পোজিশন – ৭’ নামের ছবিটি জলরঙে এঁকেছিলেন । তিনি বলেছিলেন, ‘একটি বিন্দু থেকে সব কিছুর শুরু হয় আবার বিন্দুতেই আবার সব কিছুর সমাপ্তি’।… বিমূর্ত কাজের অনুভূতি নিয়ে বলেছেন, ‘…আমার ছবিতে নির্দিষ্ট কোনো অনুভূতি থাকবে না, এ আমার কাছে ভীষণ বেদনাদায়ক একটি ব্যাপার ছিল । কিন্তু আঁকতে আঁকতে আমি লক্ষ্য করেছি ছবিটি আমাকেই শুধু আঁকড়ে ধরছে না… একটি রূপকথার মতো শক্তি আর জাঁকজমক নিয়ে আমার সমস্ত স্মৃতিকে মুগ্ধ করছে’।…

কান্দিনিস্কির আঁকা ১৯১০ এবং ১৯১২ সালের দুর্লভ দুটি পেইন্টিং দেখেছিলাম নিউ ইর্য়কের দুটি মিউজিয়ামে । যখন তিনি তাঁর ক্যানভাস অবজেক্ট ছেড়ে বাঁক নিয়েছে অ্যাবস্ট্রাক্টশনে । নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ণ আর্টের সংগ্রহে রয়েছে ১৯১২ সালে আঁকা ‘গার্ডেন অব লাভ – ২’ নামের তৈলচিত্রটি । নিউ ইয়র্কের ফিফথ এ্যাভিনিউয়ের গুগেনহহেইম মিউজিয়ামের সংগ্রহে রয়েছে ১৯১০ সালে কান্দিনিস্কির আঁকা অনবদ্য আরেকটি তৈলচিত্র ‘ল্যান্ডস্কেপ উইথ ফ্যাক্টরি চিমনি’ । এই দুটি বিখ্যাত ও অনবদ্য কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছি । আর এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে, শিল্পী মনিরুল ইসলাম, স্যারের সঙ্গে মাদ্রিদ, স্পেনের ‘হুয়ান মার্চ ফাউন্ডেশনে’ কান্দিনিস্কির এক গুচ্ছ বড় বড় কাজের প্রদর্শনী দেখেছিলাম, ২০০৩ সালে । স্যারই আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন । সেও এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা ।

৬.
বছরখানেক আগে শিল্পী মুর্তজা বশীর স্যারের সঙ্গে কথা বলছি । স্যার হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করলেন, রফী, তুমি তো অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবি আঁকো । কিন্তু অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবিই কেন আঁকো ?’ আমি মুখ নিচু করে আছি দেখে স্যার নিজে থেকেই বললেন, ইউরোপ আমেরিকাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরে জনজীবনে যে স্থবিরতা, নৈরাশ্য, মূল্যবোধ, বিচ্ছন্নতাবোধ, একাকীত্ব সহ এমন সব নানা সংকট নেমে এসেছিল— তা কিন্তু সেখানে অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের অনুকুল পরিবেশ তৈরি করেছিল । বাংলাদেশে আমি তেমনটি দেখিনি’ ।…

সত্যি তো এখানে চারপাশ জুড়ে এতো মানুষ । বাড়ি-ঘর, হাট-বাজার, দোকান-পাট সর্বত্র মানুষ আর মানুষ । মনিরুল ইসলাম স্যার আরেকটু অন্যরকম করে বলেন, ‘…কোথাও স্পেস নেই । মানুষের মধ্যে নেই । রান্না্য় নেই । যেমন আমরা জিরা, ধনে, আদা, রশুন, পেয়াজ, মরিচ, হলুদ, গোল-মরিচ, তেজপাতা— সব ব্যবহার করছি । ইউরোপ আমেরিকায় কিন্তু তা নেই । আমাদের গল্প-গানে-কথায় অনেক এলিমেন্টস । এ অঞ্চলের পেইন্টিংয়ে দেখবে অনেক এ্যালিমেন্টস, অনেক কথা । আমাদের জীবন-যাপনেও তাই !

৭.
বাইরে বৃষ্টি । শিল পড়ছে । রূপকথা অবাক হয়ে ঝুঁকে পড়ে শিল পড়া দেখছে বিস্ময়ে । আকাশ থেকে শিল পড়ার ব্যাপারটি ওর কাছে অ্যাবস্ট্রাক্টই ।… বৃষ্টি কমেছে । বাইরের ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগছে । এমনটি হলে আমি বার বারই ফিরে ফিরে যায় আমার গ্রামে । চোখ বন্ধ করললেই দেখতে পাই, আমার সরল সুন্দর গ্রামটি । ছোটোখাটো গ্রাম । ছনের-ছাত-ওয়ালা বাড়ি । বাঁখারির বেড়া দেওয়া গোল-ঘর । বাঁশঝাড় আম কাঁঠাল জাম আতা কুল খেঁজুর শিমুল কলা ওল-কচু লতাগল্ম জোঁপঝাড় জঙ্গল— ঘাটে বাঁধা মাস্তুল, পাল তোলা নৌকোর দল । বাতসে ভেসে আসছে অচেনা কোনো মাঝির গান—

পদ্মানদীর কিনারা ধরে উঠে আসা যে হাওয়া সে যেন এক শিহরণের অনন্ত অনুভব । চোখ বন্ধ করলে অনুভব করি, পাড় ভাঙছে । একটু পরে মসজিদের কিনারার আমগাছটি নদীর বুকে চলে যাবে । গাছটি বাঁকা হয়ে অপূর্ব ভঙ্গিমায় নদীর ভেতর কিছুটা হেলে গিয়েছিল । আমরা বালকেরা গাছের প্রকান্ড গায়ে উঠে শাখা – প্রশাখা বয়ে নদীর বুকে দু:সাহসিক ঝাঁপ দিতাম । নদীর স্রোত আমাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত অনেকটা উজানে ।…

বালকবেলাকার হৈ হুল্লোড়ের ভেতর মৃত্যুভয় থাকে না । আর কিছুদিন পরে মসজিদ লাগোয়া বড়-মায়ের কবর ভেঙে যাবে । নদীতে বিলীন হবে আমার বড়-মা !! সেই কষ্টই বেশি করে বাজতো বুকে । মনে মনে ভাবছি, বড়-মায়ের কবর ভেসে গেলে আমি নদীকে ক্ষমা করব না । বড়-মাকে আমি দেখি নি । নানার আম্মা । কিন্তু তাঁর একটা রূপ আমি মনে মনে তৈরি করেছিলাম । পিঠ ছাপনো চুল, জ্যোৎস্নার আলোর মতো রূপ… । পার ভাঙছে…। যারা পদ্মার পাড় ভাঙা দেখেন নি তারা ভাবতেও পারবে না তার কী ভয়ংকর রূপ । প্রবল জলের তোড়ে বিশাল মাটির চাঁই যখন ভেঙে আছড়ে পড়ে নদীর ভেতর— বুকে কাঁপন লাগে । হু হু করে ওঠে বুক । মন ভেঙে যায় ।

৮.
নদীর ভাঙনের একটি রূপ আছে । ছবি আছে । মানুষের মন ভাঙার রূপটা কি ? আমার মা প্রায় প্রায় বলতেন, ‘আমার বুকের ভেতরটা ভেঙে গেছে, তোদের যদি দেখাতে পারতাম’ ?… বালকবেলায় অত শত বুঝতাম না । নদীর ভাঙন দেখা যায় । শব্দ হয় । গাছ ভেঙে পড়া দেখা যায় । হাত থেকে গ্লাস ভেঙে পড়লেও দেখা যায়, খান খান হওয়ার শব্দও শুনি । কিন্তু বুক চুরমার হয়ে ভেঙে পড়া ? সে যে নির্জনে ভাঙে ! বুকের ভেতরে ভাঙনের ছবিও দেখা যায় না, শব্দও পাওয়া যায় না !… এই তো অ্যাবস্ট্রাক্টশন । শিল্পী গণেশ হালুই অ্যাবস্ট্রাক্টশনকে এভাবে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন ।

আম্মার কথাটি আবার কানে বাজছে, আমার বুকটা ভেঙে গেছে, তোদের যদি দেখাতে পারতাম’!.

  • সূত্রঃ
    *পেইন্টিং : শিল্পী ভাসিলি ভাসিলি কান্দিনিস্কি

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৩:৫০
    সূর্যোদয়ভোর ৫:১৭
    যোহরদুপুর ১২:০৩
    আছরবিকাল ৩:২৩
    মাগরিবসন্ধ্যা ৬:৪৯
    এশা রাত ৮:১৬

@ স্বত্ত দৈনিক দেশ, ২০১৯-২০২০

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ