ঢাকাসোমবার , ৩০ মে ২০২২
  1. অন্য আকাশ
  2. আইন আদালত
  3. আবোল-তাবোল
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপসম্পাদকীয়
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. কলাম
  8. ক্যারিয়ার
  9. খেলার মাঠ
  10. গণমাধ্যম
  11. গ্যাজেট
  12. জাতীয়
  13. টাকা-আনা-পাই
  14. দেশ জুড়ে
  15. দেশ পরিবার
এবারের বর্ষাতেই ডুবে যাবে পুরো শহর

চট্টগ্রাম, জলে ভাসা এক পদ্ম

ব্যুরো প্রধান, চট্টগ্রাম
মে ৩০, ২০২২ ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম শহরের ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনর্খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পে ধীরগতির কারণে এবারের বর্ষায়ও নগরীর অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ২০২০ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই দফায় দুই বছর সময় বাড়ানো হয়, যা এ বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্পের ৩৩ শতাংশ কাজ এখনো বাকি রয়েছে। তাই সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) প্রকল্পের মেয়াদ আরো দেড় বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয়ও বাড়ছে প্রায় দ্বিগুণ।

দুর্বল কর্মপরিকল্পনা, তাড়াহুড়া করে সম্ভাব্যতা যাচাই, জমি অধিগ্রহণজনিত জটিলতাসহ নানা কারণে প্রকল্পটি বারবার হোঁচট খাওয়া আর পাশাপাশি তহবিল প্রাপ্তিতে বিলম্ব এবং সিডিএ, সেনাবাহিনী ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এই ডুবে যাওয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের আগস্টে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিডিএর ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনর্খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়। অনুমোদনের পর ঐ বছরের নভেম্বর থেকে শুরু হয় জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের কাজ। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের জুন মাস পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষর করে সিডিএ। এরপর ২৮ এপ্রিল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। গত চার বছরে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৬৭ শতাংশ, যার মধ্যে আছে মূলত খাল বর্ধিতকরণ ও পুনর্খননের কাজ।

সংশ্লিষ্টরা দেশকে বলেন, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও অবৈধ দখলের কারণে প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। জায়গাজমি নিয়ে আদালতে মামলা-মোকদ্দমাও বিচারাধীন রয়েছে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ দুটোই বাড়ছে। ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার ব্যয় এখন ১০ হাজার কোটিতে উন্নীত হচ্ছে। এই প্রকল্প গ্রহণকালে ভূমি অধিগ্রহণের খরচ ছিল মৌজা রেটের দেড় গুণ। কিন্তু পরে সরকার তা বাড়িয়ে তিন গুণ করে।

ফলে প্রকল্পটিতে ভূমি অধিগ্রহণের খরচ প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়াচ্ছে। এছাড়া ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সঙ্গে আলোচনা করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে বেশ কিছু কাজ বাড়তি করতে হচ্ছে। নতুন করে এসব কাজ প্রকল্পটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হচ্ছে। এতে খরচ বাড়ছে। সবকিছু মিলে প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় দ্বিগুণে উন্নীত হচ্ছে।

সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর এবং ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবটি এখনো অনুমোদন না পাওয়ায় অতীতের মতো আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও জলাবদ্ধতায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছে নগরবাসী। চট্টগ্রাম চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলাবদ্ধতা সমস্যার কারণে ২০২০ সালে শুধু নগরীর খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরাই প্রায় ৫১৪ কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতাধীন ৩৬টি খালের মধ্যে মাত্র সাতটির সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। এখনো জমি অধিগ্রহণ বাকি অনেক এলাকায়। প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন এনে সংশোধিত ডিপিপি প্ল্যানিং কমিশনে পাঠিয়েছে সিডিএ। এতে ব্যয় ৫ হাজার ৬০০ কোটি থেকে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা।

জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দাকে আংশিকভাবে কাজের ধীরগতির জন্য দায়ী করা হলেও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিচালিত একটি নিরীক্ষায় বিলম্বের কারণ হিসেবে মূলত ‘ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা যাচাই নিরীক্ষণ, তহবিল বণ্টনের ক্ষেত্রে ধীরগতি, কর্মীর অভাব এবং বাস্তবায়নকারী, ঠিকাদার ও পরামর্শকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের’ কথা বলা হয়েছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এই নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও প্রকল্পের খরচ নিয়ন্ত্রণে সিডিএর নিয়মিত আর্থিক অডিট না থাকায় প্রকল্পের কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। পার্টিসিপেটরি অ্যাকশন রিসার্চ অব হিউম্যান ফর অ্যাডভান্সমেন্ট (পাড়া) নামক প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পক্ষে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করে।

নগর পরিকল্পনাবিদেরা দেশকে বলেন, এ ধরনের একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা নির্ভুলভাবে যাচাইয়ের জন্য কমপক্ষে এক বছর সময় লাগে। অথচ কাজটি সিডিএ শেষ করে মাত্র এক সপ্তাহে। এই নিরীক্ষণে জমি অধিগ্রহণ ও বিস্তারিত প্রকল্প নকশা প্রণয়নসহ বাস্তব সমস্যাগুলোকে আমলে নেওয়া হয়নি। প্রকল্প শুরুর পর সিডিএ আরেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সম্ভাব্যতা যাচাই নিরীক্ষণ পরিচালনা করে। দ্বিতীয় সম্ভাব্যতা যাচাই নিরীক্ষণ আগের কিছু সমস্যার সমাধান করলেও ইতিমধ্যে নতুন আরো কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় প্রকল্পে বড় আকারের সংশোধন আনতে হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজালে (ডিপিপি) প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের জন্য কোনো ‘ব্যাবহারিক কর্মপরিকল্পনা’ না থাকায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত খরচ অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি ছিল। উদাহরণস্বরূপ, শহরের পূর্ব অংশে খাল ও নর্দমার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপিপিতে অনুমিত খরচ ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ কোটি টাকা। কিন্তু কাজটি শেষ করতে খরচ হয়েছে ২৮৮ কোটি টাকা, যেটি অনুমিত খরচের চেয়ে ৩৮ গুণ বেশি। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ১১ কিলোমিটারের নতুন একটি খাল খননের খরচ অনুমিত খরচের চেয়ে ৮ গুণ বেশি হয়েছে। প্রকল্পের বর্তমান সমস্যাগুলোর সমাধান না করে এর সময়সীমা বাড়ানো হলে খরচের পরিমাণ আরো বাড়বে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

দেশের সঙ্গে আলাপকালে প্রকল্প পরিচালক সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কর্মকর্তা লে. কর্নেল মো. শাহ আলী বলেন, ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৬৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এর সুবাদে নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে পুরোপুরি মুক্তি না পেলেও আংশিক মুক্তি পেয়েছে, এটা আমরা জোর দিয়েই বলতে পারি। এ বছর জলাবদ্ধতায় ভোগান্তির পরিমাণ আগের তুলনায় অনেকটাই কমবে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভূমিকা রয়েছে উল্লেখ করে লে. কর্নেল মো. শাহ আলী দেশকে বলেন, চসিকের হিসাব অনুযায়ী নগরীতে মোট ১৬০০ কিলোমিটার খাল রয়েছে। এর মধ্যে আমাদের প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত খালের পরিমাণ ৩০০ কিলোমিটার। প্রকল্পভুক্ত সব খালে ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষা দেওয়াল (রিটেইনিং ওয়াল) নির্মাণ করা হয়েছে। তাই সেসব খালে পানি আটকানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বাকি ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার খালের দায়িত্ব তো সেনাবাহিনী নিতে পারে না। এটা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সেটা যদি না হয়, তাহলে আমরা এই প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাব না।

ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতায় অনেক জায়গায় কাজ থমকে আছে উল্লেখ করে লে. কর্নেল মো. শাহ আলী আরো বলেন, ‘আমরা দুই কিলোমিটার একটি খালের কাজ শেষ করেছি। কিন্তু মাঝখানে ৫০ মিটার জায়গা নিয়ে বিরোধ আছে। অবৈধ দখলদাররা সেখানে দখল করে রয়েছে। তাহলে আমাদের এই পুরো কাজটাই কোনো সুফল বয়ে আনবে না। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় আমরা কাজ শেষ করতে পারছি না।

জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অধীনে নগরীর বিভিন্ন স্থানে মোট পাঁচটি রেগুলেটর নির্মিত হবে। এর মধ্যে আগামী মাসে চারটি রেগুলেটর চালু হওয়ার কথা থাকলেও সিডিএ এখনো লোকবল নিয়োগ করেনি। এ ব্যাপারে লে. কর্নেল মো. শাহ আলী দেশকে বলেন, ‘রেগুলেটরের লোকবল নিয়োগের জন্য আমরা সিডিএকে চিঠি দিয়েছি।’

সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের এক সভায় সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান। এ বছর পুরোপুরি জলাবদ্ধতা নিরসন না হলেও আগামী বছর জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসন করতে পারব। তবে শুধু খাল খনন করলে হবে না, কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং করা না হলে কোনোভাবেই এই প্রকল্পের সুফল মিলবে না।

সর্বশেষ - আইন আদালত