1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
  3. enahidreza@gmail.com : NAHID REZA : NAHID REZA
শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী ২০২১, ০৭:৩৪ অপরাহ্ন

পুরান ঢাকায় রাসায়নিক বাণিজ্য, দায় কার?

হাসান মাহমুদ রিপন
  • আপডেট টাইম :: মঙ্গলবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২১
  • অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে ১০ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ
  • একের পর এক ঘটে যাওয়া অগ্নিকান্ডে ব্যাপক প্রানহানীর দায় নিচ্ছে না কেউ

আবাসিক এলাকায় কোনো রাসায়নিক কারখানা বা গুদাম করা আইনত নিষিদ্ধ। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে সুপারিশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পুরান ঢাকার রাসায়নিকের কারখানা আর গুদামগুলো সরিয়ে নেওয়া। কিন্তু ১০ বছরেও তা সম্ভব হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে একের পর এক ঘটছে অগ্নিকান্ড ট্রাজেডি। এখনো বহাল তবিয়তে পুরান ঢাকায় চলছে এই ব্যবসা।


রাসায়নিক দ্রব্যের কারনে এভাবে একের পর এক ব্যাপক প্রানহানীর ঘটনা ঘটলেও এর দায় নেয়নি কেউই। এমনকি  সংশ্লিষ্ট কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে এখনো আইনের মুখোমুখিও করা হয়নি। আর তাই সচেতন মহলের জিজ্ঞাসা পুরান ঢাকায় অবৈধভাবে রাসায়নিক বানিজ্যের দায় কার? তবে অনেকের অভিযোগ এ ঘটনার জন্য মূলত শিল্প মন্ত্রনালয়ই দায়ী।
জানা গেছে, কোথাও রাসায়নিক কারখানা স্থাপন করতে হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী রাসায়নিক আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসা ও ব্যবহার করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিতে হয়। এরপর ছাড়পত্র নিতে হয় বিস্ফোরক পরিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের। গুদামের নকশা, আমদানি-রপ্তানির লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সনদসহ কমপক্ষে ১৫টি শর্ত পূরণ করতে হয়। অথচ পুরান ঢাকার বেশির ভাগ রাসায়নিক ব্যবসায়ীর একমাত্র সনদ সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ দিন রাজধানীতে অবৈধভাবে রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম স্থাপন এবং এর কারনে একের পর এক ব্যাপক প্রানহানী ঘটলেও এ ব্যাপারে রাজউক, ঢাকা সিটি করপোরেশন, ঢাকা জেলা প্রশাসন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসা এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করছে না। এমনকি মাঠপর্যায়ে তাদের তদারকিও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমাদের দেশের প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রতা যেন একটি স্বাভাবিক চিত্র। নিমতলীর মতো ঘটনার পরে প্রকল্প তৈরি করে অনুমোদন করতেই সাত-আট বছর লেগে যাওয়া দায়িত্বে অবহেলা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও দীর্ঘসূত্রতার ফল।
তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলো কোনো পরিবর্তন আনতে জাতীকে বড় কোনো ট্র্যাজেডির জন্য অপেক্ষা করতে হয়।’
অপরদিকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে উদাসীনতা বা শৈথিল্যের পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কোনো নির্দেশনাকে পাত্তাই দেয় না পুরান ঢাকার রাসায়নিক ব্যবসায়ীরা। বড় ধরনের দুর্ঘটনার জন্য ব্যবসায়ীদের মনোভাবও দায়ী বলে মনে করেন আইনজীবীরা।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টেও সিনিয়র আইনজীবী এ্যাডভোকেট জাকির হোসেন বলেন, এখানে অনেকের অবহেলা রয়েছে। আইন অনুযায়ী কারখানা পরিদর্শকের নিয়মিত পরিদর্শন করার কথা। সিটি করপোরেশন কিসের ভিত্তিতে ওই ভবন থেকে ট্যাক্স আদায় করে সেটি দেখার বিষয়। যদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্যাক্স নিয়ে থাকে, তবে তারা শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেয়েছে কি না দেখার বিষয়। হয়তো দেখা যাবে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে খুশি করার মাধ্যমে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালানো হচ্ছে। এটি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। এ ছাড়া ভবন মালিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা হতে পারে, যেমনটি হয়েছে রানা প্লাজা ও তাজরীন গার্মেন্ট মালিকের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তরাও মামলা করতে পারে।
নিমতলী ট্র্যাজেডির পর কয়েকটি সংগঠনের করা এক রিট আবেদনের পর ২০১০ সালের জুনে হাইকোর্ট পাঁচ দফা নির্দেশনা সহ পুরান ঢাকার বাসাবাড়ি থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। এতে পুরান ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প, কলকারখানা ও রাসায়নিক গুদাম সরানোর নির্দেশ ছিল। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এবং একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো নির্দেশই কার্যকর হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানার মালিকরা আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে খুবই প্রভাবশালী। বিভিন্ন সংস্থাকে প্রভাবিত করে তারা কারখানা ও গুদাম বহাল রেখেছে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের বলেন, নিমতলী ট্র্যাজেডির আগে থেকেই পবা পুরান ঢাকার বাসাবাড়ি থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়ার আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু ওই আন্দোলনের সঙ্গে সরকার একমত হলেও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পেরে উঠছে না।
তিনি বলেন, নিমতলী ট্র্যাজেডির পর ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিস্ফোরক অধিদপ্তর যৌথভাবে ১৮০টি গুদাম ও ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ২০১০ সালের অক্টোবরের মধ্যে গুদামগুলো সরানোর নির্দেশ দেওয়ার পরও সরানো হয়নি। বাড়ির মালিকরা খুব প্রভাবশালী। বিভিন্ন সংস্থাকে ম্যানেজ করে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পুরান ঢাকার আরমানিয়ান স্ট্রিটের ২৬/৩ নম্বর বাড়ির নিচতলায় রয়েছে এপি গোডাউন নামে একটি রাসায়নিকের গুদাম। এর পূর্ব দিকে রাস্তা, পশ্চিমে হাসপাতাল, উত্তর ও দক্ষিণে মার্কেট। ২০০ বাই ৩০০ ফুট আয়তনের গুদামটিতে সংরক্ষণ করা হয় ক্যালসিয়াম সোডিয়াম কার্বনেট ও ব্লিচিং পাউডারের মতো দাহ্য পদার্থ।
রাসায়নিক গুদামটির মালিক মামুন দাবি করেন, বংশপরম্পরায় তারা রাসায়নিকের ব্যবসা করে আসছেন। এ ব্যবসা বন্ধ করে দিলে তার পরিবারকে না খেয়ে থাকতে হবে। তবে লাইসেন্স আছে কিনা জানতে চাইলে এর কোনো জবাব দেননি তিনি।
জানা গেছে, পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী’ নামের ২০২ কোটি টাকার একটি অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে মাত্র কাজ শুরু করেছে বিসিক। এর আওতায় কেরানীগঞ্জে ৫০ একর জমিতে একটি পল্লী গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে ৯৩৬টি প্লট পাবেন ব্যবসায়ীরা। চলতি বছর (২০২১ সালে) প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১২৪ জনের মৃত্যুর পর। ২০১১ সালে প্রকল্পটির বিস্তারিত পরিকল্পনা বা ডিপিপি তৈরির কার্যক্রম শুরু করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা বিসিক। ২০১৫ সালে বিসিক একটি ডিপিপি তৈরি করে, যেখানে কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দা মৌজায় ২০ একর জমিতে রাসায়নিক পল্লী তৈরির কথা বলা হয়েছিল। এতে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। প্রকল্পে বহুতল ভবন তৈরি করে কারখানা ও গুদাম সরানোর কথা বলা হয়েছিল। প্রকল্পের ব্যয় বহনের কথা ছিল ব্যবসায়ীদের। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বহুতল ভবনে রাসায়নিক কারখানা ও দোকানের বিষয়ে আপত্তি তোলেন। ফলে ওই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। ২০১৭ সালের মার্চে আবার নতুন একটি ডিপিপি তৈরি করে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বিসিক, যেখানে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নে রাসায়নিক পল্লী স্থাপনের কথা বলা হয়। ডিপিপি যাচাই-বাছাই করে শিল্প মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।
সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা হয় ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার পরবর্তী বাজেটে প্রকল্পের বরাদ্দ মেলে। ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ নেই। চলতি বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বই ঘেঁটে এ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
রাসায়নিক পল্লী প্রকল্পের পরিচালক সাইফুল আলম বলেন, ‘আমি এখন কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক কাজ করে রাখছি। প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ পেলেই যাতে দ্রুত জমি অধিগ্রহণ করা যায়।’
শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ হুমায়ূন বলেন, রাজধানীর পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদামগুলো সরিয়ে গাজীপুরের কাঠালিয়া মৌজায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য ছয় একর জমির ওপর প্রায় ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সেখানে পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে অস্থায়ী কেমিক্যাল গুদাম।
শিল্পমন্ত্রী বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সাময়িকভাবে রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণের জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। আর স্থায়ী সমাধানের জন্য মুন্সিগঞ্জে বিসিক কেমিক্যাল শিল্পনগরী গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ শিল্পনগরী স্থাপনের পরপরই অস্থায়ী গুদাম থেকে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবসায়ীদেরকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে মুন্সিগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন কাঠালদিয়ার এই অস্থায়ী গুদাম ও স্থাপনা বিএসইসি’র অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টিল ওয়ার্কস লিমিটেড ব্যবহার করবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে পুরান ঢাকার জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
এদিকে সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুকে দোষারোপ করে ১৪ দলীয় জোটের শরিক সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেছেন, সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু যদি গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন, তাহলে হয়তো এত দিনে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন সরানো সহজ হতো।
তিনি বলেন, ‘আমার পরে যিনি শিল্পমন্ত্রী (আমু) ছিলেন, তিনি যদি সিরিয়াসলি নিতেন, তাহলে পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন রিলোকেট করা সহজ হতো। কেমিক্যাল বিজনেস রিলোকেট করার জন্য আমি মন্ত্রী থাকাকালে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কেমিক্যাল মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বিসিক, তারা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা ঢাকার বাইরে একটি জমিতে স্থানান্তরিত হবে। এটা আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিল। কিছু ডিসক্রিট ব্যাপারের কারণে পুরো ব্যাপারটি এগোয়নি।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক হিসাবে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে বাসাবাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ২’শ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা রয়েছে এলাকায়।
জানা গেছে, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামগুলো সরানোর দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২০১৭ সালের মার্চে একবার অভিযান শুরু করলেও কয়েকদিনের মাথায় তা থেমে যায়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিষ্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকার রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামগুলো সরাতে আমরা বারবার প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে চিঠি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ডিএসসিসি জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছি। ইতোমধ্যেই কিছু কারখানার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ডিএসসিসি গত বছর পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় ২৯টা দাহ্য পদার্থ স্টক করা যাবে না মর্মে নির্দেশনা জারি করে। তবে কিছু স্যাম্পল রাখতে পারবে। তাদের গোডাউন কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাবে। এখানে তারা ট্রানজেকশন করবে। ডেলিভারি দেবে সেখান থেকে। তারপরও কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী আইন অমান্য করে অবৈধভাবেই পুরান ঢাকায় এ ব্যবসা চালাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের দাবি, রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামগুলো উচ্ছেদ অভিযানের ব্যাপারে তিনি মেয়র থাকাকালে সিটি করপোরেশনের আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয় এবং ব্যবসায়ীদের বড় সংগঠন এফবিসিসিআইর অনুরোধে তারা তৎকালীন সময়ে ঐ অভিযান এগিয়ে নিতে পারেননি।
সাবেক এই মেয়র বলেন, “আমরা একটা ম্যাসিভ ড্রাইভ দিলাম। তৎকালীন সময়ে আমরা অনেকগুলো কারখানা বন্ধ করলাম, মামলা করলাম, সিলগালা করলাম। তখন এফবিসিসিআই এবং শিল্পমন্ত্রী (তৎকালীন) আমাকে বলেন, বিসিক শিল্প নগরী হলে এগুলো উঠিয়ে দিতে। আমাকে অনুরোধ করা হলো তাদেরকে কিছুটা সময় দিয়ে স্থানান্তর করতে। তখন এ প্রক্রিয়াটা থেমে গেল। নইলে ওই সময়েই একটা ধাক্কা দিয়ে দিতাম।”
সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমরা ঐ সময়ে বলেছি পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় ২৯টা দাহ্য পদার্থ স্টক করা যাবে না। স্যাম্পল কিছু রাখতে পারবে। তাদের গোডাউন কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাবে। এখানে তারা ট্রানজেকশন করবে। ডেলিভারি দেবে সেখান থেকে। এর মধ্যেই চকবাজারের ঘটনাটা ঘটে গেল।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর লালবাগ, ইসলামবাগ, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি, চকবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর, শ্যামপুর ও কদমতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় অলিগলিতেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কারখানা। অবৈধ কারখানার মধ্যে রয়েছে, ব্যাটারি তৈরি, নকল ওষুধ, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক সরঞ্জাম, নকল বৈদ্যুতিক কেবল, ঝালাই, খেলনা ও জুতা-স্যান্ডেলসহ শতাধিক পণ্য তৈরির কারখানা। এসব পণ্য উৎপাদনে বেশির ভাগ কারখানায় ব্যবহার করা হয় দাহ্য কেমিক্যাল। বিশেষ করে জুতা তৈরির ফ্যাক্টরিতে যে সল্যুইশন ব্যবহার করা হয়, সেগুলো খুবই বিপজ্জনক বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, পুরান ঢাকার বাসাবাড়িতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে জুতা কারখানা। এসব জুতা কারখানার সল্যুইশনে আগুন লাগলে তা খুবই দ্রুত ছড়ায়। তাই ঘনবসতি এলাকা ও বাড়িঘরে কারখানা গড়া ঠিক নয়। নিমতলীর ঘটনার পর কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও অবৈধ কারখানার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ঢাকা) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, পুরান ঢাকার এসব রাসায়নিকের গুদামের ৯৮ শতাংশই অনুমোদনহীন। অগ্নি দুর্ঘটনার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে এসব গুদাম।
প্রসঙ্গত, নিমতলীতে আগুনের নয় বছরের মাথায় এর এক কিলোমিটারের মধ্যে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আবারো একই বীভৎস রূপ দেখল পুরান ঢাকাবাসী। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে রাসায়নিক থেকে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ ওই আগুনে মৃত্যু হয়েছিল ১২৪ জনের। এরপর চকবাজারে মৃত্যু হয় ৬৭ জনের। এর মধ্যে পুরুষ ৫৬ জন, নারী সাত ও শিশু রয়েছে চারজন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫০ জন। নিখোঁজ ২৬ জন। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী রাত সাড়ে ১০টার দিকে চকবাজারের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদসংলগ্ন আসগর লেন, নবকুমার দত্ত রোড ও হায়দার বক্স লেনের মিলনস্থলে ঘটে এ অগ্নিকান্ড। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট রাতভর চেষ্টা চালিয়েও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। পরে যুক্ত হয় পুলিশ ও র‌্যাব। একই বছর ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ আবারো ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে রাজধানীর বনানীর ১৭ নম্বর রোডের এফ আর টাওয়ারে। ২৮ মার্চ দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে আগুনের এ ঘটনা ঘটে। ঐ সময় ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে অংশগ্রহন করে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনে। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৭০ জনেরও বেশি মানুষ। যদিও এ অগ্নিকান্ড ভবনের ত্রুটিজনিত কারনে হয়েছিল বলে তখন প্রাথমিকভাবে ধারনা করেছিলেন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ।
এদিকে নিহত শ্রমিকদের পরিবার প্রতি ১ লাখ টাকা এবং আহতদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা কওে তৎকালীন সময়ে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ৩০ লাখ টাকা হস্তান্তর করেছিলেন। এর মধ্যে ২০ লাখ টাকা দগ্ধদের চিকিৎসা এবং বাকি টাকা দাফনের জন্য খরচ করা হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও সরকারের পক্ষ থেকে আরো ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল তখন।

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

বিশ্বে করোনা ভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
৫৩০,৮৯০
সুস্থ
৪৭৫,৫৬১
মৃত্যু
৭,৯৮১
সূত্র: আইইডিসিআর

বিশ্বে

আক্রান্ত
৯৬,৭৪১,৮৫০
সুস্থ
৫৩,০৬৮,১০৩
মৃত্যু
২,০৭০,৮৩০

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৫:২৩
    সূর্যোদয়ভোর ৬:৪২
    যোহরদুপুর ১২:১০
    আছরবিকাল ৩:১৬
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:৩৮
    এশা রাত ৬:৫৭

স্বত্ব @২০২০ দেশ

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ