1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন

উড়াল

জাফরানি

শামীম আজাদ
  • আপডেট টাইম :: রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

সে ছিল ১৯৯৭ সালের মধ্য অগাস্ট। বিলেতের বাসি আপেল গাছের নিচে পড়ছে ঝুপ ঝুপ। সুন্দরী রাজকুমারী ডায়ানা বেঁচে আছেন।  ক্ষিপ্ত রাজবাড়ির অহংকারে ঘা দিয়ে তার তুঙ্গ প্রেম চলছে মিশরীয় ধন কুবের মোহাম্মদ আল ফায়াদ এর এক মাত্র পুত্র দোদী ফায়াদের সঙ্গে। মাত্র ক’মাস পরেই তারা দু’জনই প্যারিসে মারাত্মক এক সড়ক রহস্যময় দূর্ঘনায় মারা যাবেন। কিন্তু তখনো যেহেতু তা ঘটেনি সবই ঠিকঠাক  চলছে। কেবল পাপারাজ্জিদের তোলা ডায়ানা ও দোদীর নানান ছবিতে সান বা মিরর  বিলেত তোলপাড় করছে।


আন্ডারগ্রাউন্ড ষ্টেশনের নাম নাইটস ব্রিজ। নেমেই হ্যারডস। বিলেতের সব চেয়ে দামী শপিং মল আল ফায়াদ এর হ্যারডস। আমি তার একটি লাউঞ্জে বসে কফি পান করছি। আমরা সবাই বিখ্যাত অভিনেতা  সৈয়দ জাফরির অপেক্ষায়। একটু পরেই তিনি আসবেন। বাংলাদেশী নামকরা রেস্তোঁরা ব্যবসায়ী আমিন আলীর বই একটি রান্নার বইয়ের উদবোধন করবেন। আমি মহা উত্তেজিত। একেতো হ্যারডস। তার উপর আমার কবিতাও এখান থেকেই পাবো। আজাদ আমাকে ফিস ফিস করে শান্ত করার চেষ্টা করছে।

চতুর্থ তলার ভেতরের সব তাতেই হাল্কা নরম জলাপাই রঙ। মোড়কে মোড়কে স্তরে স্তরে দামের মহা গন্ধ। ভেতরের সুবেশী নরনারীকে মনে হচ্ছে সবুজ জলে ভেসে বেড়ানো ফরাসী ফুল। যে স্বর্নাভ কফি কাপ থেকে চুমুকে চুমুকে গরম তরল গলা দিয়ে অন্ত্রে পৌঁছে দিচ্ছি তাতে যেন বাইরেও আমার কন্ঠার সিরা উপসিরা সোনালি হয়ে যাচ্ছে ! ন্যাপকিনের কোন কোনা ধরে তুলে আনবো তাও ভাবছি। স্ন্যাক্স নিচ্ছি ভয়ে ভয়ে।

সে বছর ভারতের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে আমেরিকার বিশ্ববিখ্যাত পত্রিকা ’নিউ ইয়র্কার’ এক বিশেষ সংখ্যা বের করেছে। বিলেত আমেরিকার তো বটেই তাতে উপমহাদেশের বিখ্যাত কোনো লেখক বাদ যান নি। বিক্রম জাব্বালা, অরুন্ধতী রায়, সালমান রুশদী, অমিতাভ চৌধুরী সহ আরো কজন। সালমান রুশদী তখন তাঁর স্যাটানিক ভার্সেস এর জন্য এক লিজেন্ড হয়ে গেছেন। এতে আছে দূর্দান্ত সব লেখা। কিন্তু চমক হল এই যে সেখানে ছাপা হয়েছে বাংলাদেশের একটি মাত্র কবিতা। কবিতাটি বাংলা থেকে ইংরাজীতে অনুবাদ করেছেন ড. ক্যারোলাইন রাইট ও ড. সৈয়দ মঞ্জুরুল  ইসলাম। শিরোনাম, ‘মোস্ট বিউটিফুল সুইট থিঙ’। সে ছিল এ অধমেরই লেখা ।

মনে হল অগাস্টের আপেল ফেটে গেছে। যেন, বন্যা দূর্ভিক্ষের দেশে কবিও আছে একথা সারা ইংল্যান্ড হঠাৎ পেয়েছে সে খবর। পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশের মুদির দোকান, মসজিদের কাছে ব্রিকলেনে এক কবিও থাকে! সবার কাছে এ খবর এমন আর আমি বুঝলাম আমার কবিতা  যেমন তেমন। দুই ঝানু অনুবাদক মিলেই ওকে সুন্দর করে তুলেছে। ক্যারোলাইন কে ফোন করে ঐ কথা বলাতে একটা ধমক লাগালেন, শামীম অনেক সাবমিশন থেকে তোমার কবিতা নির্বাচিত হয়েছে, বার বার এভাবে আমাদের অনুবাদ ভালো হয়েছে বোল না তো। আর নিউ ইয়র্কার এর সাহিত্য সম্পাদক বলে কথা!

শোনার পর থেকে ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটাহাঁটি শুরু করে দিয়েছিলাম।  আমেরিকা থেকে আমার সৌজন্য কপি ডাকে আসার আগে তা পাই কি করে? ক্যারোলাইন বললেন, যে কোন বড় বুক শপেই পাবে। আমি বললাম, হ্যারড্‌স এ? তাহলে তো আর কথাই নেই। বাহ আমি আর আজাদ যাচ্ছি, রেডফোর্টের আমীন আলীর একটা রান্নার বইর প্রকাশনা উৎসব হবে। অভিনেতা সৈয়দ জাফরী প্রধান অতিথি।

আজাদকে রেখে আমি লিফট দিয়ে বুককর্নারে গিয়ে ম্যাগাজিনটি চাইলাম।  অর্থমূল্যে এমন দামের একটি ম্যাগাজিন আমি দু’খানা কিনছি! সেলস বালিকা একটু শিওর হতে চাইলে একটু লজ্জিত কিন্তু গর্বিত স্বরে বলি, ইয়ে মানে দু’কপি এ জন্যে যে আমার কবিতা উঠেছে কিনা। ও, আচ্ছা। একি সে কিনা বিকারহীন? দ্যুৎ! লিফট এর ভেতরে আমি নিজের নাম সূচীতে দেখে মরেই গেলাম।  অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠানের জায়গায় পৌঁছুলাম।

এমন সময় তিনি প্রবেশ করলেন। শুরু হল অনুষ্ঠান। আমি অনুষ্ঠানের কিছুই শুনলাম না। শুধু ফাঁকে ফাঁকে তাকে দেখি। আমি তার এত ভক্ত এত ভক্ত। কারন খুব কম সংখ্যক ভারতীয়ই বিলেত আমেরিকার চলচ্চিত্রে এত নাম করেছেন। পিটার সেলার্স ভারতীয় এ্যাকসেন্ট দিয়ে মন জয় করেছেন সবার কিন্তু তিনি ভারতীয় নন। সৈয়দ জাফরি এসে সে স্থান দখল করেছেন। আর তাকে কিনা সামনে দেখছি! অনুষ্ঠান শেষে তাইতো তাঁকে ঘিরে এত ভিড়।  কোন মতে পায়ের মাথায়  উঁকি দিয়ে গলা ভাসিয়ে চি চি করে বললাম, আমি বাংলাদেশের মানুষ। তিনি তাকালেন। আমি আপনার বড় ভক্ত।

আমি আপনাকে নিয়ে অনেক জানি। আপনার মঞ্চনাম ছিল জাগদীপ। আসল নাম সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ জাফরি।

আপনার ছবি জুয়েল ইন দা ক্রাউন, এ্যা পেসেজ টু ইন্ডিয়া,সতরঞ্জ কি খিলাড়ী,গান্ধী সব সব আমার দেখা। আমি এদেশে এসেছি ১৯৯০ সালে। তারপর বিলেতে ১৯৮৫ দেখেছি আমার প্রিয় অভিনেতা স্টিফেন ফ্রেয়ার্স নির্দেশিত হানিফ কোরেশীর লেখা ব্রিটিশ ধারাবাহিক কমেডি ড্রামা মাই বিউটিফুল লন্ড্রেট । আপনি কি দারুন অভিনয় করেন! এক নিঃশ্বাসে এই কথাগুলো বলে থামলাম। তিনি মিষ্টি হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আর কি জানি? আমি বললাম, আপনার শিশু অভিনেতা হিসেবে মঞ্চেপ্রবেশ। অনেক ভাষা বলতে পারেন। রেডিও মঞ্চ টেলিভিশনচলচ্চিত্র সর্বত্র অভিনয় করেছেন।কৌতুকাভিনেতা ও ছিলেন।

৪০০’র বেশি ব্রিটিশআমেরিকান ও ভারতীয় ছবিতে অভিনয় করেছেন। বলেই থেমে গেলাম কি করে বলি  আরো জানি তিনি মধুর নামের এক সুন্দরী অভিনেত্রীকে বিয়ে করেছিলেন চুটিয়ে প্রেম করে। আর সেই সুন্দরী রমনীও কম যান না। তিনি হয়েছিলেন স্বনাম ধন্য মধুর জাফরি। টিভিতে রান্নার শো করতেন। মাধুর ব্রান্ডে পাওয়া যায় আচার। হয়তো এই হ্যারডসেই আছে।

-আর?

আমি পেছনে তাকিয়ে তাকিয়ে নিপুনভাবে সেজে আসা নারীদের দেখি। সবাই এদিকে তাকিয়ে। তখন প্রায় থরো থরো কম্পমান হয়ে কি বলে ছিলাম আজ আর তা স্পষ্ট মনে নেই। তবে হয়তো এরকম কিছু  একটা বলেছিলাম,

-ইট্‌স মাই লাকী ডে স্যার। আই মেট ইউ এ্যান্ড যাস্ট কালেক্টেড দা ম্যাগাজিন হোয়ার মাই পোয়েম গট পাবলিশড এ্যাজ ওয়েল। ভদ্রলোকের গোঁফের নিচে জেগে উঠেছিলো এক কৌতুকময় হাসি।

 -ক্যান আই সি দ্যাট?

-অফ কোর্স। ইট উড বি মাই প্লেজার।

হাতে নিয়ে, কভারে তাকিয়ে একটু বিস্মিত হলেন। মনে হল সেই প্যাসেজ টু ইন্ডিয়ার হামিদুল্লাহ আমাকেই দেখছেন। বললেন,

-ইট ইজ নট যাস্ট এ্যা ম্যাগাজিন। ইট ইজ দ্য প্রেস্টিজিয়াস নিউ ইয়র্কার মাই ডিয়ার! তারপর তিনি তাঁকে ঘিরে দাঁড়ানো ভিড়কে বললেন, গিভ মি এ্যা সেকেন্ড।

এবার হতভম্ব আমাকে হাতে ধরে দৃঢ় ভাবে বসার স্থান পেছনে ফেলে আমাকে নিয়ে সবাইকে ছেড়ে বেরিয়ে এলেন একদম কোনায়। যেখানে খাবার সারি সারি। স্যূপ এর সুগন্ধ ম ম। তিনি ম্যাগাজিনটা খুললেন, সূচীর সব নামগুলো একে একে পড়লেন, স্মিত হাসলেন, আমার পুরো কবিতাটা পড়লেন। তারপর জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, কাছে এসো! আমি তোমার জন্য বিশেষ দোয়া করবো। আমার তো  দামী কার্পেটে পা আঁটকে যাচ্ছিলো।

-এবার চোখ বন্ধ করো।

আমি চোখ বন্ধ করলাম। বুঝলাম একঘর মানুষের শব্দ শান্ত হয়ে গেছে। আমি মাথায় চুলের উপর তার হাতের স্নেহ স্পর্শ ও কানে আরবী আয়াতের মৃদু ধ্বনি পেলাম।আল্‌তো করে আমার মাথায় হাত রেখে ঠিক আমাদের মত দোয়া পড়ে ফুঁ দিলে আমি চোখ খুললাম।

– তুমি বড় কবি হও মা। অনেক বড় কবি। বলে আমার হাতে হাল্কা চাপ দিয়ে আবার ভিড়ে মিশে গেলেন। অনুষ্ঠান চলতে লাগলো। ফিরতি পথে টেনে উঠেও আমার সে বিহব্বলতা কাটলো না।

স্মৃতিতে আমার এ উড়ালের হয়ে গেল আজ ২৩ বছর! আর এই নভেম্বরের ২ তারিখে বিলেতে ঘোষিত হয়েছে আমার দি ন্যাশনাল লটারির মত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে কবি হিসেবে কমিউনিটি এওয়ার্ড ২০২০ লাভ করার সংবাদ। এর স্বীকৃতি হিসেবে আমার পোর্ট্রেট গত ২ নভেম্বর থেকে প্রদর্শিত হচ্ছে ইংল্যান্ডের ন’টি স্থানের আর্ট গ্যালারিতে। হবে ডিসেম্বরের ৩ তারিখ অবধি। সারা ইংল্যান্ডের ছ’হাজার জন থেকে নির্বাচন করা হয়েছে  মাত্র ১৩ জন! আর আমি তার এক জন! ভাবা যায়? যায় না।  এবং গা কাঁটা দেয়ার মত আরেকটি তথ্য এই যে সেই বিখ্যাত মানুষটির প্রয়ানও হয়েছে ২০১৫ এর এই নভেম্বর মাসেরই ১৫ তারিখে এই লন্ডনেই। কেমন কাকতালীয় না? হয়তো, হয়তো না।

লেখকঃ কবি, লেখক ও কলামিস্ট

২২ নভেম্বর ২০২০

লন্ডন

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

বিশ্বে করোনা ভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
৪৭৩,৯৯১
সুস্থ
৩৯০,৯৫১
মৃত্যু
৬,৭৭২
সূত্র: আইইডিসিআর

বিশ্বে

আক্রান্ত
৬৪,৫২০,৩৫০
সুস্থ
৪১,৪৮৮,৪০৬
মৃত্যু
১,৪৯৩,৬২৪

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৫:০৭
    সূর্যোদয়ভোর ৬:২৭
    যোহরদুপুর ১১:৪৯
    আছরবিকাল ২:৫১
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:১১
    এশা রাত ৬:৩২

স্বত্ব @২০২০ দেশ

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ