1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৪:১৭ অপরাহ্ন

কেনাকাটাঃ অনলাইন ভরসা, অনলাইন নিরাশা

আলিমুজ্জামান
  • আপডেট টাইম :: শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২০

ক.

বাড়িওয়ালার ছেলে নজরুল ঘড়ি পেয়েছে। করাচী থেকে প্যাকেট এসেছে। ডাক পিয়ন প্যাকেটটা নিয়ে এসেছে এক্ষুনি।


খবরটা মুহূর্তেই চাউর  হয়ে যায়। শুনে, চারপাশ থেকে আমরা হুটোপুটি করে ছুটে যাই নজরুলদের বাসার দিকে। আমি, দুলু, হিটু, ইকবাল এবং আরো ক’জন। সবমিলিয়ে ১০/১২ জন তো হবেই।  গিয়ে দেখি, সত্যিই। ডাক পিয়ন নজরুলদের বারান্দায় দাাঁড়ানো। নজরুল আর ও’র বড় বোন নীরু আপা, ছোট বোন মীরা পিয়ন’কে ঘিরে দাাঁড়িয়ে। কোনো এক ছুটির দিনের ঘটনা। আমরা কেউ-ই স্কুলে যাইনি সেদিন। নীরু আপা, মীরা, নজরুল সবার মুখেই হাসি। নজরুলের মুখের হাসিটা বেশ চওড়া আর খুব যেন উজ্জ্বল। ও’দের কাছেই দাাঁড়ানো ডাক পিয়নটার মুখেও হাসি।  আমরা সবাই পৌঁছুতে পৌঁছুতেই ডাক পিয়ন একটা কাগজ মেলে ধরলো, বারান্দায় রাখা টেবিলের উপর। নজরুলের দিকে তাকিয়ে বল্লো, এই যে কাগজটার এইখানে আর এইখানে, এই দুই জায়গায় তুমি তোমার নামটা লেখো। মুখে চওড়া হাসি নিয়ে নজরুল নীরু আপার হাত থেকে একটা ঝকঝকে ঝর্ণা কলম নেয়। তারপর খুব যত্ন করে নিজের নাম লেখে, ছাপানো কাগজটার যে জায়গা দু’টি ডাক পিয়ন দেখিয়ে দিয়েছে সেইখানে। পাশে দাাঁড়িয়ে থেকে হাসি, হাসি মুখে নীরু আপা, মীরা দেখছিলো। ভীড় করে আমরাও দেখছিলাম। নাম লিখে নজরুল নীরু আপার দিকে তাকায়। তাকানোর মানে ‘ঠিক আছে কিনা’। নজরুল কোনো রা’ না করলেও নীরু আপা হেসে বলেন, ‘হ্যাাঁ ঠিক আছে।’

নাম লেখা হয়ে গেলে কাগজটা নিয়ে, যত্ন করে ভাাঁজ করে ব্যাগে ঢোকায় পিয়ন। সাথে, সাথে চারকোনা একটা প্যাকেটও বের করে। প্যাকেটটা খুব মজবুত করে আাঁটকানো আর ‘সীলমোহর’ করা। তুলে দেয় নজরুলের হাতে। নজরুল প্যাকেটটা নিয়ে নীরু আপাকে দিতে গেলে, নীরু আপা হাত ইশারায় থামিয়ে দেন। বলেন, ‘প্যাকেটটা খোল। সবাই দাাঁড়ায়া রইছে দেখবো বইল্যা, দেখুক।’ বলে হেসে আমাদের দেখেন। প্যাকেটটা আস্তে-ধীরে খুলে নজরুল। যেনবা, প্যাকেটটা ব্যথা পাবে!  প্যাকেট খোলা হয়ে যেতেই, ঝাাঁ চকচকে একটা রূপালী হাত ঘড়ি চোখ ধাাঁধিয়ে দেয়। কে, কতো কাছে থেকে দেখবে,এইরকম একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় যেন। ঘড়ির প্যাকেটটা উপরে সাদা, কি যেন লেখা, আর ভেতরের দিকটায় লাল ‘ভ্যালভেটে’র কাপড় সাাঁটানো।

এই হাত ঘড়িটা’র প্রতি এতো যে কৌতহল, তার মূল কারণ, নজরুল মোটে’ ১০টাকা দিয়ে এই আড়াইশ’ টাকা দামের ঘড়িটা পেয়েছে! একজনের কাছ থেকে ১০টাকা দিয়ে একটা কার্ড কিনে নেয় নজরুল। তারপর সেই কার্ডটা পূরণ করে করাচীতে পাঠিয়ে দেয়। করাচী থেকে নজরুলের কাছে আসে ২৫টি কার্ডের একটি প্যাকেট। নজরুল ২৫টি কার্ড ২৫জনের কাছে ১০টাকা করে বিক্রি করে তা’ আবার পাঠিয়ে দেয় করাচীতে। ব্যস, তারপর এই ঘড়ি…!

ঘটনাটা পাকিস্তান আমলের। সম্ভবত ক্লাস ফোর, ফাইভের ছাত্র আমি। ভাড়া থাকি মনিপুরী পাড়ায় নজরুলদের বাসায়। মনিপুরী পাড়ায় সেইসময় দালানকোঠা বলতে এক, দু’টি বৈ তেমন কিছু ছিলোই না। নজরুলদের বাসা ছিলো ‘হাফ বিল্ডিং।’ আমাদের বাসা, ভিত পাকা, বাাঁশের চওড়া চিকন,চিকন চটি দিয়ে কোনাকুনি নকশা করা, কাঠের গাাঁথুনি দিয়ে দু’রুমের। একটা আমগাছ নিয়ে বেশ লম্বা একটা উঠোন। ঘরের কাছাকাছি রান্নাঘর, একটি কুয়ো বেড়া দিয়ে দু’পাশের বাসার জন্য দু’ভাগ করা। কুয়োর পাড়টা পাকা করা। গোসল, ধোয়া-পাকলা ওখানেই। পশ্চিম দিকে, বেশ দূরে শেষ মাথায় ‘টয়লেট’। আর কয়েকটা বাসার জন্য, বাসার সামনের খোলামেলা জায়গায় একটি ‘টিউবওয়েল’। খাবার পানির ব্যবস্থা । প্রতিটি বাসাই বাাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা।    আমার জীবনের প্রথম চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর ঘটনা এটি। সেই সাথে হাতঘড়ির স্বপ্নটাও আমার বুকে গোঁথে যায়। অতি কষ্টে ১০ টাকা জোগাড় করে একটি কার্ডও কিনি। সেসময় আড়াইশ’ টাকা মানে যেমন অনেক বড় একটি ব্যাপার। তেমনি পিতৃহীন আমার জন্য ওই বয়সে ১০ টাকা জোগাড় ছিলো অনেক কঠিন ব্যাপার। কিন্তু কষ্ট করে জোগাড় করা ১০ টাকা এবং স্বপ্ন স-ব ধূলিস্যাৎ হয়ে গেলো। আমার কাছে পরবর্তীতে যে ২৫টি কার্ড আসে তার এক, দুটি বিকোতে পেরেছিলাম মাত্র। নির্দিষ্ট সময়ে আর কিছুই করতে পারিনি। যাদের কাছে কার্ড দু’টি বিক্রি করেছিলাম, তাদের ১০টাকা করে ২০টাকা আবার ফেরত দিতে হয়। এই ২০টাকা ফেরত দিতে গিয়ে আমি কতো যে নাজেহাল হয়েছি, মা কষ্ট পেয়েছে, ছোট বোন মনিও কোঁদেছে অনেক। এই কষ্টের ক্ষত এখনও রয়ে গেছে। এই কষ্টের যাতনায় বলতে গেলে,আমি জীবনে ঘড়িই পরিনি আর। মনির বিয়ের পরপরই ও’র বাসায় বেড়াতে গেলে, হঠাতই আমার পাশে বসে বলে, ‘দাদা তোমার বাাঁ হাতটা একটু এদিকে দেও তো।  কেনো?  দেওনা, হাতটা বাড়াও না, দরকার আছে।’  আমি আস্তে করে হাতটা বাড়াই। মনি হাতটা ও’র কোলে টেনে নিয়ে, চমৎকার একটা ঘড়ি আমায় পরিয়ে দেয়। পরিয়ে দিতে,দিতে বলে ‘খবরদার দাদা ঘড়িটা তুমি খুলবা না, ঘড়িটা পরবা।’ মনির দিক চেয়ে থেকে, থেকে আমার চোখে জল জমে ওঠে…।  মনি জানতো আমার ‘সেন্টিমেন্ট’, মনে রেখেছিলো। এরপর থেকে আমি ঘড়ি পরেছি বেশ কিছুদিন। একটা ‘একসিডেন্টে’ ঘড়িটা ভেঙে গেলে আবার পরা বন্ধ। বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ির উপহার হিসেবেও পরেছি কিছুদিন। তারপর বাদ। এখানে, সেখানে পরে থেকে ঘড়ি কোথায়, হ’দিশই রাখিনি আর। দরকারও পড়েনা। ‘স্মার্ট ফোনে’ তো সবই আছে।  ঘড়ি প্রসঙ্গটা হয়তো বেশীই এলো। আমার প্রথম স্বপ্নের সাথে প্রথম ‘ওমন’ কেনাকাটা এতোটাই জড়িয়ে যে, এড়াতে পারিনি। আমার শিশু, কৈশোরের মাঝখানের সময়ের ‘ওমন’ কেনা কাটারই তো আধুনিক রূপ, এখনকার এই ‘অনলাইন’ কেনাকাটা।

খ.

আজ নভেম্বর মাসের ২০ তারিখ শুক্রবার, সাল ২০২০। এই ২০/২০২০ আর কি কখনও আসবে? তারিখটা উল্লেখ করতে গিয়ে নিজেই চমকে গেলাম! চমকিত হলাম, হচ্ছি ‘অনলাইন’ কেনাকাটা নিয়েও। এই ‘ডিজিটাল’ জমানায় এবং এই ‘করোনা’ সময়ে কেনাকাটা প্রায় পুরোটাই চলছে ‘অনলাইনে’। সারা পৃথিবী জুড়েই। আমি পৃথিবীতে যাবোনা। নিজ দেশের, নিজের ঘরের কথাই বলি দু’চারটে।

ক’দিন আগে স্ত্রীকে বল্লাম, ‘লুঙ্গি না হলে তো আর চলছে না গো।’

লুঙ্গি কিনো। স্ত্রীর উত্তর।

কোথা থেকে, কি ভাবে কিনবো?

তাই তো। কোনখান থাইকা কিভাবে কিনবা? বলে স্ত্রী। একটু চুপ থেকে বলে, ‘আরে এক কাজ করো, ‘অনলাইন’-এ কিনো।

‘অনলাইন’-এ লুঙ্গি?

তুমি তো দেখি দুনিয়ার কোনো খোঁজখবরই রাখো না। এখন কি আর সেইদিন আছে। সুঁই, সুতা থেকে বাজার-সদাই, ওষুধপত্র, কাপড়চোপড়, জুতা মুজা, বাড়িঘর, গরু,ঘোড়া, ভেরা কি নাই, কি পাওয়া যায়না ‘অনলাইনে’…?

আমার ছোট ছেলে শীর্ষকে বলি, বাবা দেখ তো ‘অনলাইনে’ লুঙ্গি কোথায় পাওয়া যায়? আমার জন্য দু’টি লুঙ্গি কিনতে হবে। শীর্ষ জানে আমি ‘প্রিন্টের’ লুঙ্গি পড়ি। সুতি বা লিলেন কাপড়ের। খানিক বাদে শীর্ষ ডাকে, ‘দেখে যাও বাবা পাওয়া গেছে। তোমার পছন্দ হয় কিনা দেখো। প্রিন্টের লুঙ্গি এই দুই রকমেরই আছে।’

আমি ও’র কম্পিউটারের পাশে গিয়ে দেখি। একটা মোটামুটি পছন্দ হয়, অন্যটা একদমই না। কিন্তু একইরকম দুইটা নেবো না। আর কোনো ‘অপশনই’ নেই, তাই যা’ আছে তা-ই। এই ‘করোনা সময়ে’ কোনো বাজার বা শপিংমলে গিয়ে খোঁজারও তো কোনো উপায় নেই।

পরদিনই লুঙ্গি চলে এলো। ‘পার্সেল’ যে নিয়ে এলো, তার কাছ থেকে স্লিপ দেখে, টাকা দিয়ে নেয়া হলো। কিন্তু প্যাকেট খোলে লুঙ্গি হাতে ধরে দেখে তো থ’! খুবই বাজে মিশ্রণ সুতার পাতলা ফিনফিনে, কাঁচা রঙের প্রিন্ট-এর লুঙ্গি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাল্টানোর ‘অপশন’ ছিলো। কিন্তু আমার যে না হলেই নয়। অতএব…।

অনেকেই হাটবাজারে যাচ্ছেন বটে। কিন্তু ‘করোনা সময়’ এবং নানাবিধ কারণে আমার বেলায় সেটি হচ্ছে-ই না। চালডাল, পিঁয়াজ, রশুন, তেল, মরিচ ইত্যাদি একটি পুরনো চেনা দোকানে ফোন করে দিলে দিয়ে যায়। কিন্তু কাঁচাবাজার?

এই ঢাকা শহরে মাছমাংস, সবজি ইত্যাদির জন্য নামীদামী দু’চারটে দোকান আগে থেকেই আছে। ‘করোনা সময়ে’ এসে এসবের সংখ্যা যে কতো হয়েছে, তার হিসেব নেই।

পরপর ক’দিন নামীদামী দোকানের মধ্য থেকে একটি দোকান বেছে নিয়ে, কাঁচা বাজার আনলাম। আর বুঝলাম, ছবিতে যা’ দেখায় বা সশরীরে গিয়ে আনলে যা’ পাওয়া যায়, তার কোনো কিছুই ‘অনলাইনে’ ও’রা দেয়না। ও’রা দেয় বাতিল হয়ে যাওয়া, ‘এক্সপায়ার’ হয়ে যাওয়া সব জিনিসপত্র! এ থেকে সদ্য গজিয়ে ওঠা দোকানগুলো সম্পর্কে খুব সহজেই একটি ধারণা পাওয়া যেতেই পারে।

শেষে.

 আজকের দিনে। সবই যখন ডিজিটাল, তখনও আমাদের মানসিকতার কোনো উত্তরণ নেই। যে বিষয়ের অবতারণার চেষ্টা করেছি। সে বিষয়টি বিস্তর ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এক মহান দলিল। যৎসামান্য উদাহরণে, আমাদের অসততা ও দৈন্যতা যে কতো ঘৃণ্য, এইটুকুতে তারই নমুনা

ফুটে উঠেছে।

শুধুই পোশাক-আশাক, বাজার-সদাই, মাছমাংস, শাকসবজি নয়। ‘করোনা’র এই দুঃসময়ে হেনো কোনো জিনিস নেই, যা’র ‘অনলাইন’ কেনাকাটা নেই!

‘অনলাইন’ কেনাকাটার সাথে এখন ‘অনলাইন’ অসততা, ‘ডিজিটাল’ চুরি যুক্ত হয়েছে। এসব কি আর আইন দিয়ে বন্ধ করার ব্যাপার, আইন দিয়ে বন্ধ করা যায়? ‘করোনা’র মতো এমন ভয়ঙ্কর দুঃসময়েও এমন ঘৃণ্য মানসিকতা যাদের,তাদের এমন অসততা, চুরির জন্য যদি তাদেরকে ঘায়েল করতে এগিয়ে আসে ‘করোনা’ তো…?

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

বিশ্বে করোনা ভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
৪৫০,৬৪৩
সুস্থ
৩৬৪,৯১৬
মৃত্যু
৬,৪২০
সূত্র: আইইডিসিআর

বিশ্বে

আক্রান্ত
৫৯,৭৫০,৯৮৮
সুস্থ
৩৮,২৬০,৪৮০
মৃত্যু
১,৪০৯,১৬০

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৫:০১
    সূর্যোদয়ভোর ৬:২০
    যোহরদুপুর ১১:৪৫
    আছরবিকাল ২:৫০
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:১১
    এশা রাত ৬:৩০

স্বত্ব @২০২০ দেশ

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ