1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৫:০৭ অপরাহ্ন

দুই চাকার জীবন (পর্ব-১৩)

শীত বিকেল

সালেহ আহমদ, সম্পাদক, দেশ
  • আপডেট টাইম :: শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০২০

১.

মনটা ভারী হয়ে আছে। আমার প্রিয় মুজিব মামি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন মাত্র দিন তিনেক আগে। সারাটা জীবন তাঁর সংগ্রামেই গেছে। দুটো ছেলে আর একটা মেয়ে মোনাকে রেখে মামা ক্যানসারে মারা গেলেন প্রায় পঁচিশ বছর আগে। বিধবা মামি তিন সন্তান নিয়ে অকুল সাগরে ভাসলেন। নিকটজনের সহযোগিতা তেমন পাননি। শ্বশুর বাড়ীর লোকজন গ্রামের বাড়িতে থাকতে বলেছিল, মামি স্বামীর ভিটায় যাননি। মুজিব মামার একটুকরো জমি ছিলো সিলেট উপশহরে। তাই বিক্রি করে যে পুঁজি হলো তাই দিয়ে ছোট খাটো ব্যাবসায় খাটালেন। মেয়ের বিয়ে হলো লন্ডনে, পাত্র এ্যারোনোটিকাল ইন্জিনিয়ার। সেই বিয়েতে হৈ-হুল্লোড় করলাম আমরাই।


ঢাকা থেকে দল বেঁধে গেলাম সবাই। যতসামান্য সাহায্য করতে পারলাম।  নানা জটিল রহস্যের কারনে মোনার চাচারা আসলেন না। বিয়ে কিন্তু থেমে যায়নি। মোনার চাচারা, মানে আমার মামা, তাদের বলেছিলাম, দ্যাখো, এই মোনাই পরিবারকে কোথায় নিয়ে যায়।
মোনার দুই ভাই লন্ডন থেকে গ্রাজুয়েশন করলো। দুই ভাইই বিয়ে করেছে। একজন লন্ডনে, আরেকজন আমেরিকায়। কয়েক বছর  ধরে মামি ফোনে বলতেন, দ্যাখো সালেহ, আল্লাহ আমাদের  তিমির রাত্রি শেষ করেছেন। কত সাহায্য করেছো তোমরা। আল্লাহর রহমতে এখন আমিও জাকাত ফিতরা দেই।
মোনা আজ লন্ডন, কাল দুবাই করে। দুবাই এলেই ফাঁক করে সময় বের করে মাকে দেখতে চলে আসে। ঢাকায় আসার আগে ফোন করে বলে,ভাইজান তোমার জন্য কি আনবো?
আমার স্ত্রী ঠাট্টা করে বলে, মোনাকে বলো, দুটো সোনার বালা আনতে। দুবাইতে নাকি সোনা সস্তা আর সোনার মান খুব ভালো।
মোনা খুব হাসে। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। বলে, ভাইজান ভাবিকে বলো,বেশী করে দোয়া করতে।
মোনা সিলেট যাওয়ার পথে ঢাকা থামে। ওর বাচ্চাদের নিয়ে একরাত আমাদের এখানে থেকে যায়। কত রকমারি চকোলেট আর অসম্ভব সুন্দর সব গিফট নিয়ে আসে।
মুজিব মামি চলে গেলেন চুপচাপ। খবর পেলাম হাসপাতালে ভর্তি। তারপর আই সি ইউ। ছোট ছেলে মাহফুজ দেশে ছিলো। সে-ই সব দেখাশোনা করলো। আমার ছোট বোন বেবি বলেছিল, তুই টেষ্ট করে দেখ, তোর ওতো টেষ্ট করা দরকার।
মাহফুজ বললো, মাকে আমারই দেখতে হবে। আমার করোনা পজিটিভ জানাজানি হলে ওরা আমাকেও  আটকে রাখবে। মাকে কে দেখবে?
ছোট ছেলে মাহফুজের দেখাশোনার স্নেহাদ্রতা নিয়ে চুপচাপ মুজিব মামি চলে গেলেন।
মোনা একটাদিন ফোন করে কাঁদেনি ফোনে, দুটো ছেলেও কাঁদেনি।
আমরাও তেমন প্রতিক্রিয়া জানাইনি। কিছু কিছু মৃত্যুতে কারো কোন কিছু যায় আসে না। মুজিব মামির শ্বশুর বাড়ির লোকজনও তেমন প্রতিক্রিয়া করেননি। একটা মৃত্যুর পর কিছু ছোট খাটো সামাজিকতা হয়, প্রিয় মানুষ হারানোর বেদনা জানান দেয়া হয় এই সব অনুষ্ঠানে।
মুজিব মামির ভাগ্যে সেটাও জুটলো না।
করোনা একদিন শেষ হবে, কিন্তু করোনার ইতিহাস লেখার সময় হয়তো এই সামান্য মানবিক গল্পের দিক গুলো কেউ বলবে না।
মুজিব মামির শ্বশুর বাড়ি আমার নানা বাড়ি। বাড়িটাকে সুরমা নদী প্রায় গিলে খেয়েছে। আমি খুব স্মৃতি কাতর মানুষ। গেলো বছর ঠিক এই সময় খোয়াজ পুর কানুনগো বাড়ি গিয়েছিলাম। শৈশবের কত শত স্মৃতি জড়ানো এই বাড়ি। মায়ের সাথে কতবার এসেছি এই বাড়িতে। আমারতো নানি ছিলেন না। হয়তো মায়ের তেমন যত্ন-আত্তি হতোনা তখন। দাদাবাড়ী আসলে কথা শুনতে হতো হয়তো। কতবার শিশু মনে প্রশ্ন জাগতো, মা নানাবাড়ি থেকে কাঁদতে কাঁদতে ফিরতো কেন?
গাছের চারা গুলো সার বেধে মিলিটারির মতো দাঁড়িয়ে আছে

গাছের চারা গুলো সার বেধে মিলিটারির মতো দাঁড়িয়ে আছে

নানার শেষ বয়সে শরীর মোটেও ভালো যায়নি।ডায়াবেটিস তাঁকে দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী করে রেখেছিলো।

নানা বাড়ি থেকে ফেরার সময় মা খুব কাঁদতেন। মেয়েদের বিয়ের পর স্বামী গৃহই সব। নির্দিষ্ট অনুমোদিত দিন শেষে মাকে ফিরতেই হতো। নানাকে একলা রেখে।
মেয়েদের এসব জল ফেলার কোন মানে হয় না।
সুরমা নদীর  ওই পাড়ের কোল ঘেষে অসম্ভব সুন্দর একটা পাহাড়। শীতে এই পাড় মানে নানাবাড়ির উঠোনে দাড়িয়ে টিলাটাকে দেখে মনে হয়, গিলে খাই।
শীত বিকেল খুব কম সময়ের হয়। টিলার ওপারে সূর্য সোনালী ছায়া ফেলতে ফেলতে ডুব দিচ্ছে। নদীর টলমল পানিতে তার ছায়া পড়েছে। করুণ বাঁশির সুরের মতো। আমাদের এই দিকে নদীপাড়ে, লাইন ধরে সব্জি লাগানো হয়েছে। চারা গুলো এখন বাড়ন্ত, আকাশ ছোঁবে যেন। মিলিটারিদের মার্চপাস্টের মত সব সবজি চারা গুলো এটেনশন পজিশনে দাঁড়িয়ে।
নদীপাড়ের টিলা, সোনালী আলোয় চিক চিক নদীর পানি। দাঁড়িয়ে থাকা চারা গাছ, আমাকে বিমোহিত করে।
মুজিব মামির জন্য মন কেমন করে ওঠে।
২.
সে অনেক দিনের কথা। পঞ্চাশ বছর তো হবেই। ঢাকা শহর চষে  বেড়াই লেখক হবো বলে। পুরান ঢাকা, মধ্য ঢাকা, নতুন ঢাকা সর্বত্র আমার বিচরণ। কোনদিন কবি জসিমউদদীনের কমলাপুরের পলাশ বাড়ির সাহিত্য সাধনা সংঘ, কোন দিন সবুজ পাতার অফিস, নয়াপল্টনে, বংশাল রোডে দৈনিক সংবাদের খেলাঘর, পূর্বদেশের চাঁদের হাটে, দৈনিক আজাদের মুকুলের মহফিল আরো কত কত জায়গায়।
এর মধ্যে কবি জসিমউদদীনের ভালো  ‘মিরাসদারি’ ছিল। কমলাপুর কবি জসিমউদদীন রোডেই তার একতলা সুন্দর ছিম ছাম জমিদার স্টাইলের বাড়ি। সামনে অনেক খালি জায়গা।বাড়ির পিছনে দুগ্ধ খামার।
কবি জসিমউদ্দিনের বাগানে নানা রকমের ফুলের সমাহার। সম্ভবতঃ ওনার বাগানেই এই রকম একটা ফুল ঝাড় দেখি। অন্য ফুল গুলো থেকে আমার চোখ এই লাল ফুলের ঝাড়ে এসে আটকে থাকে।
আমার বিশ্ব বিদ্যালয়ের সহপাঠী প্রফেসর হাবিবা মুস্তফা, প্রায় নিয়মিত নানা ভাবে তার মনের মাধুরি আর নির্মলতা প্রকাশ করেন। ফুল, গাছ ,পাখির ছবি দিয়ে। তাঁর একাগ্রতায়  মুগ্ধ হয়ে অনেক বাহবা লিখি। মনের ভিতর থেকেই আমার ভালো লাগার প্রসন্নতা তাঁকে জানাই।
পুরানো জায়গা নতুন করে দেখতে ভালো লাগে আমারো, সবার মত। সেই যুবক বয়সে দেখা এই লাল ফুল  নতুন করে বন্ধু  হাবিবার ক্যামেরায় দেখে চকিতে দূর যৌবনে ফিরে যাই।
লালিমা ফুল

লালিমা ফুল

লাল গুচ্ছ ফুল, কমলাপুর ষ্টেশন, বি-১/ডি-২ মতিঝিল কলোনি, হোটেল আল হেলালের এ পাশে বিশাল পুকুর, এক সাঁতারুর ৭২ ঘন্টা ওই পুকুরে সাঁতার কাটা, বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনির দেয়াল ডিঙিয়ে মসজিতে জুম্মার নামাজ পড়তে যাওয়া, বিআরটিসির বাস ডিপোর খালি জায়গায় আজম খানদের দলের সাথে ক্রিকেট ম্যাচ খেলা।

হাবিবার একটা ছবি আজ আমার অনেক কিছু ওলট পালট করে দিল।  এই শীত বিকেলে। ধুলায় কিংবা কুয়াশায় বাইরের যা কিছু দেখছি সব ধূসর। মন খারাপ করা বিষন্নতায় ভরা।
হাবিবা লিখেছে এই ছবিটা সুদূর ইউরোপের রোমে তোলা। ফুলের নাম “ল্যানটানা”। আমি ওকে প্রস্তাব দিলাম এই ফুলের নাম ” লালিমা” দেয়া যায় কী না, “ল্যানটানা’র সাথে মিল রেখে। হাবিবা বললো, লালিমা দিতে তার আপত্তি নেই।
এই ফুল কমলাপুর  কিংবা রোমে ফুটুক,তার সবইতো এই পৃথিবীরই জমিন।
আজ থেকে এই ফুল বাংলাদেশে ফুটলে আমি বলবো, লালিমা ফুল।
রক্তিম আবির মাখানো ফুল।
লালিমা, আমার যৌবন জাগালো আজ।

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

2 thoughts on "শীত বিকেল"

  1. আতাহার খান says:

    সুখপাঠ্য রচনা। ধন্যবাদ।

  2. আতাহার খান says:

    কোথায়ও আটকায়নি, এক নিঃশ্বাসে স্মৃতিনির্ভর রচনাটি পড়া শেষ করলাম। গদ্যভঙি চমৎকার। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

বিশ্বে করোনা ভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
৪৫০,৬৪৩
সুস্থ
৩৬৪,৯১৬
মৃত্যু
৬,৪২০
সূত্র: আইইডিসিআর

বিশ্বে

আক্রান্ত
৫৯,৭৫০,৯৮৮
সুস্থ
৩৮,২৬০,৪৮০
মৃত্যু
১,৪০৯,১৬০

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৫:০১
    সূর্যোদয়ভোর ৬:২০
    যোহরদুপুর ১১:৪৫
    আছরবিকাল ২:৫০
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:১১
    এশা রাত ৬:৩০

স্বত্ব @২০২০ দেশ

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ