1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ০১:২০ অপরাহ্ন

তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? ট্রেন থামে?

সালেহ আহমদ, সম্পাদক, দেশ
  • আপডেট টাইম :: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২০

[১০ম পর্ব]


হেমন্ত আসছে হয়তো। কত দিন খবরের কাগজ দেখি না। ভোরের দিকে একটু শীতলতা অনুভব করি। আশ্বিন মাসের শেষের দিকে শরতের ঝিরঝিরে পেলব বাতাস যখন আরো একটু উদাসী হয়, আরো একটু মনটাকে ভিজিয়ে দেয়, তখন বুঝি বাইরের আকাশে হেমন্ত রাগ  চলছে।


সাদা তুলোর মেঘে ভিতরটা মখমলের মত নরম থাকে। বাইরের প্রকৃতি আমার মনে খুব প্রভাব ফেলে। অকাল প্রয়াত কবি আবিদ আজাদের মত, নিজেই নিজের সাথে কথা বলি, তোমাদের উঠোনে কি ট্রেন থামে? বৃষ্টি নামে?

আমাদের উঠোনেও ট্রেন থামে। শীতের কুয়াশা রাতে ট্রেন যেমন হুশ হুশ শব্দ করে জীবনের অনেক না বলা কথা বলতে বলতে অন্তহীন অন্ধকার গ্রাস করে শব্দের মাধুরী নিয়ে ছুটে চলে, আমার উঠোনের ট্রেনটাও ওরকমই। ট্রেনের ছুটে চলা যেন প্রকৃতির চাইতেও সুন্দর। ভিতরে জুবু থুবু মানুষ।সবাই ধ্যান মৌন। একেকটা গম্ভীর ফেরেশতা যেন ট্রেনে বসা মানুষের মুখের ঠোট, কান, কপাল সব কিছু সিল করে দিয়েছে।
আমার উঠোনেও ট্রেন থেমেছে। গহীন রাতে টিনের চাল হেমন্তের ছোয়াঁয় কাঁপে। টুপ-টাপ টিনের চাল থেকে কুয়াশার পানি পড়ে নীচে। মাটিতে পটুয়ার আকাঁ ছবির মত নকশা তৈরি হয়। ভালো লাগায় মনটা কোমল হয়ে আসে, সত্যি তখন আমার উঠোনে ট্রেন থামে, বৃষ্টি হয়।
এই যে আমাদের পুকুর ঘাট, কী প্রসন্ন ও শান্ত! কয়েকটা  হলুদ পাতা গাছ থেকে পড়েছে পুকুরে ,পানির ওপর পাতা ভাসছে। হেমন্তের আকাশ পুকুরটাকে আয়না বানিয়ে নিজে যেন ধরা পড়েছে। পেঁজা তুলোর মেঘ বলছে, বলতো,দেখতে আমি কেমন?  তখন আমার উঠোনে বৃষ্টি নামে, ট্রেন থামে।
গ্রাম ছুঁয়ে বড় হাওর থেকে সুরমা নদীর সাথে মেশা খাল। খালের ওপারে কবর। একটা বাঁশঝাড়, ছাতিম গাছ, জারুল গাছ। আমি বাঁশঝাড়কে চোখে চোখে রাখি। কারন, আমি জেনেছি ওখানেই আমার দাদির কবর। কবরের ধার ঘেঁষে অবারিত ধানক্ষেত। হেমন্ত বাতাসে কচি ধানের চারা দোল খায়।খালের পাশের উঁচু জমি দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ। হাটতে হাটতে টিলার ওপরে ভাসা একটা গ্রাম, নয়া মাটি। গ্রামের ঢোকার পথেই মসজিদ।
উঁচু টিলাগ্রামে উঠলে বিস্তির্ণ ফসলের মাঠ, গুচ্ছ গুচ্ছ সাজানো গ্রাম। আবার ফসলের মাঠ, আবার গ্রাম। বড় হাওরের পানির কলকলানি আবার গুচ্ছ গ্রাম। হাওরের শুকনো পারে মাইলের পর মাইল “সনউরা”। গ্রামের জোয়ান  পুরুষ সন কাঠছে। পাশেই নৌকা বাঁধা। সারি সারি কাটা সনের গোছায় নৌকা ভরা হচ্ছে। খাল ধরে সুরমা নদী হয়ে রাজাগঞ্জ বাজারে এ গুলো বিক্রির জন্য আসবে। হাওরের আরেকটু দূরে ‘আটলার’ পাহাড়। ওখানে বিছানো আছে প্রকৃতি থেকে পাওয়া না না ধরনের গাছ। গাছ কাটা হচ্ছে, এগুলো লাকড়ি করা হবে। এগুলো যাবে সিলেট সুরমা ব্রীজের নীচে। নৌকা নিয়ে গ্রামের পুরুষরা যায়। ভালো দামে বিক্রি হয় সন ও জ্বালানির জন্য লাকড়ি।
পারকুল, নয়ামাটি, গাজিপুর, খালপার, মির্জাগড়, মইনা, সাত গ্রামের মানুষ সন কাটে, লাকড়ি সংগ্রহ করে শহরে যায়। মানুষের ঘামে ভেজা শরীরের পেশী শিল্পী সুলতানের আকা ছবির পেশির মতো উঠানো, তাগড়া। ফলের মৌসুমে নৌকা ভরে কাঠাল ওঠে বাজারে। আমাদের ৭২ বিঘার পাহাড় এখন ভাগ হতে হতে প্রায় বিনাশের পথে। পাহাড় এখন টিলা, ন্যাংটো টিলা। গাছ নেই। অভাবের তাড়নায় গাছ বিক্রি হয়ে গেছে। এখন আমাদের বাজারে কাঠাল আসে চালানে, পাইকাররা অন্য যায়গা থেকে নিয়ে আসেন।
গ্রামের মুরব্বি গোছের গেরস্থ ছাড়া এখনকার যুবকরা আর কৃষিকাজে নেই। গ্রামের পথে জাংক খাবারের প্যাকেট, পানির প্লাস্টিকের বোতল, চালের প্লাস্টিক ব্যাগ, বিস্কুটের রাংতা পাওয়া যায়। গ্রামের জোয়ান পুরুষের পেশী দুর্বল, জিন্সের প্যান্ট, চোখা জুতো, চেক সার্ট পরা যুবকের দল, মোবাইল নিয়ে বিশ্ব দেখে। চাষ করাকে তারা ছোট কাজ মনে করে। গ্রামের অর্থনীতির চাকা রিয়াল, ডলার, দিরহামে চলে।
নানুষ তার মুল পেশা ভুলে যাচ্ছে। গ্রামের ডিসপেন্সারি ব্যবসা চাঙা। বৌ ঝিরা বাচ্চা বিয়োয় ক্লিনিকে। কে কত বেশি টাকা খরচ করে ক্লিনিকে চিকিৎসা করাতে পারে, চলছে তার প্রতিযোগিতা।
পারকুল গ্রাম জেগে ওঠে ফজরের আজানের শুরু থেকে। ফজরের নামাজ শেষের পরেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মসজিদে আসে কায়দা-সিপারা পড়তে। ছেলে মেয়েরা নমিত থাকে তাদের আচরনে। বড়দের সামনে ছোটরা বিনয় মেনে চলে, সালাম বিনিময় করে আগে।
এখন সময় বদলে গেছে।
কৃষি নির্ভর আমাদের এলাকা হয়েছে, রেমিট্যান্স নির্ভর। লুঙ্গির জায়গা নিয়েছে প্যান্ট। পান সুপারির যায়গা নিয়েছে নুডুলস, চা আর বেকারির নানা মনোহারি বিস্কুট।
এখন বিবাহ ও নানা পারিবারিক পালা পর্ব ঘরে হয় না। শেখ বোরহানউদ্দিন সড়কের পাশে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই গড়ে উঠেছে কমিউনিটি সেন্টার।বাবুর্চি পেশার রমরমা ব্যাবসা এখন। রাজাগন্জ বাজার প্রতি শুক্রবার ও শনিবার বসতো। এখন আর বার নেই, এখন রোজ বাজার বসে। বাচ্চারা, জিলাপি, ময়রার বিস্কুটের বায়না ধরেনা। ওরা কোল্ড ড্রিংসে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
আমাদের পাঁচ গ্রামে এখনো জমি চাষ হয়। চাষ দিতে আসেন ময়মনসিং, কুড়িগ্রামের লোক। লেখা পড়া শিখে নতুন প্রজন্ম নতুন ভাবনা শিখেছে , কৃষিকাজ ছোট কাজ। লেখাপড়া শিখে প্যান্ট পরে কৃষিকাজ হয় না। লুঙ্গি পরে কৃষি কাজ হয়। শিক্ষিত মানুষ কেন লুঙ্গি পরবে?
আমার দাদি খোলা আকাশে, অগ্রহায়ণ মাসে নবান্নের কালে, ধানের খর দিয়ে সাময়িক ঘর বানাতেন। ওটাকে হয়তো আধুনিক কালে তাবুঘর বলা যায়। খোলা আকাশের নীচে  ধান মাড়াই হতো, আমাদের আনন্দের দিন হতো তখন। দাদির আঁচল ধরে থাকি। গাজিপুর থেকে বলাই, মাখন আসতো। টুকরিতে করে খাবার প্লেট, মুরির চাকতি, জিলাপি আর কখনো কমলা নিয়ে। মাঠের ভারা ভারা ধানের ঢিবি হয়ে উঠতো আমাদের “তাবুঘর”।
দাদি বলতেন, কে আগে ধানের পাহাড়ে উঠতে পারবে, দেখি?
আমরা হৈ হুল্লোড়ে সব চাচাতো, ফুফাতো ভাইবোন ধানের পাহাড়ে উঠতাম। সোনালী দানার পাহাড় গড়িয়ে পড়তো তাবু ঘরের খোলা মাটিলেপা মাঠে। দাদি আমাদের লুটোপুটি উপভোগ করতেন। আবার ঝাড়ুদিয়ে সব কটা শস্য দানা একত্রিত করে আবার একটা ধানের পাহাড় তৈরি করতেন।আমার দাদি রাজা, আর আমরা তার প্রজা, সৈনিক, বরকন্দাজ স-ব কিছু। দাদি আদর করে আমাদের বলাই, মখনের মজাদার খাবার কিনে দিতেন, নতুন ওঠা ধান দিয়ে।
আমার দাদি কে মনে পড়ছে খুব। মনে পড়ছে, গ্রামীণ সমাজের কৃষি নির্ভর লেনদেনের স্মৃতি।
আমার দাদির আনন্দের পৃথিবী আর নেই। উন্নয়নের ন্যাংটো থাবায় কৃষি অর্থনীতির দেশটা হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শৈশবের মতো।
একটা জীবনে আমরা কত কিছু দেখি। বনে জংগলে ছাওয়া টিলা ন্যাড়া হয়, সনের বন হারিয়ে যায়। এখন গ্রামের বাড়িতে সন দিয়ে চাল হয় না, টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে ঝম-ঝমা-ঝম-ঝম ।
জীবন হারায় জীবনের আড়ালে
জেগেও ওঠে জীবন থেকেই,
এখন আমাদের উঠোনে
ট্রেন থামেনা, বৃষ্টি পড়েনা।

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

বিশ্বে করোনা ভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
৪০৬,৩৬৪
সুস্থ
৩২২,৭০৩
মৃত্যু
৫,৯০৫
সূত্র: আইইডিসিআর

বিশ্বে

আক্রান্ত
৪৫,৫৭৬,৯৯০
সুস্থ
৩০,৫৩৮,১৯৪
মৃত্যু
১,১৮৮,৭৮৭

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৪:৪৭
    সূর্যোদয়ভোর ৬:০৪
    যোহরদুপুর ১১:৪২
    আছরবিকাল ২:৫৬
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:২০
    এশা রাত ৬:৩৭

স্বত্ব @২০২০ দেশ

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ