1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৮:০২ অপরাহ্ন

ফজলে লোহানী ও তাঁর পরিবারঃ স্মৃতিমধুর সেই সব দিন

সৈকত রুশদী
  • আপডেট টাইম :: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

গণমাধ্যম, রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে বিপুল অবদান রেখেছে বাংলাদেশের বিখ্যাত লোহানী বংশ। বৃহত্তর পাবনা জেলার (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলা) উল্লাপাড়া এলাকায় বসতি স্থাপনকারী এই বংশের এক কৃতি সন্তান সাংবাদিক, লেখক ও সম্প্রচার ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী।


লোহানী বংশের বর্তমান উত্তরসূরীদের অন্যতম প্রখ্যাত বিজ্ঞাপন নির্মাতা, ব্যবসায়ী ও আবৃত্তিকার শাকিব লোহানীর ফেসবুকে দেওয়া তাঁর পাঁচ বছর আগের এক পোস্ট আমাকে মনে করিয়ে দিল ফজলে লোহানী এবং তাঁর পরিবারকে ঘিরে আমার কৈশোরকালের কিছু স্মৃতি। সেইসব স্মৃতি এখনও আমাকে উদ্বেলিত করে।
ফজলে লোহানী এবং তাঁর পরিবার আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ছিলেন বনানীর সাত নম্বর সড়কের এইচ ব্লকে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত।
লোহানী পরিবারের সাথে প্রথম পরিচয়ের সময় আমার বয়স চৌদ্দ। দশম শ্রেণীতে পড়ি।
এই পরিবারের জ্যেষ্ঠতম সদস্য ছিলেন লেখক, অভিনেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক ফতেহ লোহানী শিক্ষাবিদ ও সংগীতশিল্পী হুসনা বানু খানম ও ফজলে লোহানী – এ তিন ভাইবোনের স্নেহময়ী মা ফাতেমা লোহানী। অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষিকা তখন আংশিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। তাঁর স্নেহের কথা আমার ভুলবার নয়।
তাঁদের বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ সিদ্দিক হোসেন খান লোহানী তখন প্রয়াত। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অগ্রগণ্য এবং ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’কে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অন্যতম নেতা।
ফজলে লোহানী যখন সপরিবারে ভাড়া আসলেন আমাদের ঠিক পাশের বাড়িতে, তখন তাঁর স্ত্রী এলিজাবেথ লোহানী ছিলেন ব্রিটেনে।
তাঁদের সন্তান, আমার চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট ইয়াসমীন লোহানী ও তার ছোট ডেভিড ইউসুফ লোহানীর সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় লাগেনি।
দুই বাড়ির মাঝে একটি দেয়াল থাকলেও ব্যবধান ছিলনা বললেই চলে। সাথে একটা পোষা বানর নিয়ে ইয়াসমীন ছোটাছুটি করতো দুই বাড়িতে।
আমার ছোট বোন পেরী’র (বর্তমানে বার্মিংহাম প্রবাসী Amina Chowdhury Perry) সাথেও তার ভাল বন্ধুত্ব হয়েছিল।
এই দুই ভাই বোনের জন্য আমাদের বাসার দুয়ার, পেয়ারা ও বড়ই গাছ ছিল অবারিত। আমার মা, মামী ও মামারা সকলেই ওদের খুবই স্নেহ করতেন।
১৯৭০ দশকে ঢাকা টেলিভিশনে ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কারণে আমার তিন মামার ছোট দুই জন তাঁর সম্পর্কে ভালই জানতেন।
পরে জানতে পারি ১৯৫০-এর দশকে তাঁর একটি টাইপরাইটার সম্বল করে বাইসাইকেল যোগে ঢাকা থেকে ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক হয়ে এশিয়া ও ইউরোপ ভ্রমণ এবং ১৯৬০-এর দশকে লন্ডন থেকে জাগুয়ার গাড়ি চালিয়ে ঢাকায় আগমনের দু:সাহসী অভিযানের বিবরণ। তারও আগে ‘পূর্ববাংলা’ ও ‘অগত্যা’ পত্রিকা সম্পাদনা।
আমার দিনের একটা সময় কাটতো ফজলে লোহানীর বাড়ির ড্রয়িং রুম ও লাইব্রেরীতে। বই পড়ায় আগ্রহ দেখে তিনি আমাকে সস্নেহ অনুমতি দিয়েছিলেন তাঁর হাজার হাজার বই সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত লাইব্রেরী ব্যবহারের।
ব্রিটেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বইয়ের পাশাপাশি একেবারেই নতুন যে বিষয় সম্পর্কে জানলাম, সেটি হলো গণ চীনের বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা।
স্বাধীনতার পরপর বিনামূল্যে বিতরণ করা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘উদয়ন’ ও ‘সোভিয়েত নারী’র মতো বাংলা সাময়িকী এবং প্রগতি প্রকাশনের বাংলা অনুবাদে রুশ বই বাংলাদেশের আনাচে কানাচে পৌঁছে গিয়েছিল। সমাজতন্ত্রের ভাল দিকগুলো সম্পর্কে বাংলাদেশের অনেকের ধারণার সূচনা ঐসব প্রকাশনা থেকে।
কিন্তু ফজলে লোহানী ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে চীনের বিপ্লব পূর্ববর্তী ও বিপ্লব উত্তর সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে পড়ে ভিন্নতর ধারণাও হল। ভারতে নকশালবাড়ি আন্দোলন সম্পর্কে কিছু বই এবং মাওবাদীদের প্রকাশনা ‘অনীক’ সহ কিছু পত্রিকাও পড়েছি সেসময়।
ঐ বাড়িতে প্রথম দেখি থ্রি-ইন-ওয়ান টার্নটেবল। জানতে পারি ৩৩ ও ৪৫ আরপিএম রেকর্ডের পার্থক্য সম্পর্কে। মনোপলি খেলতে শিখি। লিভারপুল এফসি’র সমর্থক ডেভিডের কাছে ইংলিশ ফুটবল লীগ সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাই।
ছোট্ট ডেভিড ও ইয়াসমীন এবং এলিজাবেথ ও ফজলে লোহানীর ছবিগুলো সেই সব কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ফজলে লোহানী সেই সময়ে মওলানা ভাসানীর পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক প্রাচ্যবার্তা’র সম্পাদক। তিনি লিখতেন টাইপরাইটার ব্যবহার করে।
ঐ সময় তিনি একটি বাংলা উপন্যাস লিখেছিলেন টাইপ করে, কোনো এক পত্রিকার ঈদ সংখ্যার জন্য। নাম সম্ভবত: ‘প্রথম বাঙালিনী’। ভাই ও বোন ছাড়াও তাঁর বাড়িতে তাঁর বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে আসতেন খ্যাতিমান গল্পকার আনিস চৌধুরী।
১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে ঢাকায় মওলানা ভাসানীর ভূখা মিছিল থেকে, অথবা পরে ফজলে লোহানীকে গ্রেফতার করা হয়।
ফতেহ লোহানী সপরিবারে এসে ডেভিডদের নিয়ে গিয়েছিলেন এলিফ্যান্ট রোডে নিজের বাড়িতে। পরে এলিজাবেথ লোহানী ঢাকায় আসলে ডেভিডরা ফিরে আসে বনানী। কিন্তু বাবা কারাগারে বন্দী থাকায় ছোট্ট দুই ভাইবোনের মুখে আগের মতো আনন্দ ও হাসি আর ফিরে আসেনি।
গ্রীন হেরাল্ড স্কুলের ছাত্র দুই ভাইবোনের নিত্যকার ঘোরাঘুরির রুটিনও বদলে গিয়েছিল।
এলিজাবেথ লোহানী কাজ করতেন ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন’-এর ঢাকা কার্যালয়ে। মুক্তি পেয়ে ফজলে লোহানী বাড়ি ফিরে আসার পর ডেভিডরা প্রচণ্ড খুশী হয়েছিল। কিন্তু মায়ের নজরদারিতে প্রতিবেশী বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা ও ছুটোছুটির লাগামহীন স্বাধীনতা দুই ভাই-বোনের আর আগের মতো ফিরে আসেনি।
১৯৭৪ সালে আমার এসএসসি’র ফলাফল জেনে ফজলে লোহানী প্রশংসা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি সপরিবারে ব্রিটেন চলে যান।
পরে গণমাধ্যমের জন্য বিখ্যাত লন্ডনের ফ্লিট স্ট্রীট থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বিশ্বমানের সাময়িকী ‘ওয়ার্ল্ড টাইমস’।
১৯৮০র দশকে তাঁর সাথে একবার ঢাকায় দেখা হয়েছিল।
তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলাম এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িতে। ১৯৮৫ সালের ৩০ অক্টোবর। বাংলাদেশের এক প্রতিভাবান ও গুণী সন্তানকে শ্রদ্ধা জানাতে।
টেলিভিশন মাধ্যমটি বহু মানুষকে দিয়েছে পরিচিতি, খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা। কিন্তু পেশাদারিত্বে ও জীবনাচরণে সময়ের চেয়ে অগ্রগামী ফজলে লোহানী তাঁর আধুনিক চিন্তা-ভাবনা ও সৃজনশীলতা দিয়ে টেলিভিশন মাধ্যমটিকে জনপ্রিয় করেছিলেন বাংলাদেশে।
এক্ষেত্রে তিনি একজন পথিকৃৎ।
এতো অল্প বয়সে বন্ধু ডেভিড লোহানীও চলে গেল যে তাকে বিদায় জানানোর সুযোগ পেলামনা।
প্রতিবেশী হিসেবে লোহানীদের পেয়ে আমার জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে নানাভাবে। তবে সবচেয়ে বড় পাওয়া, এডভেঞ্চার প্রিয় সাহসী এক আধুনিক বাঙালির কাছে সাংবাদিক হওয়ার অনুপ্রেরণা।
এই বংশেরই অপর দুই কৃতি সন্তান শিক্ষাবিদ ও লেখক তাসাদ্দুক লোহানী এবং মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক, সাংবাদিক ও অগ্রগণ্য সংস্কৃতি কর্মী সম্প্রতি প্রয়াত কামাল লোহানী।
সাংবাদিকতা পেশাসূত্রে কামাল লোহানীর সাথে আমার পরিচয় হয় ১৯৮১ সালে। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিটিউটে। সে আরেক অধ্যায়।
টরন্টো
৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৪:৪৭
    সূর্যোদয়ভোর ৬:০৩
    যোহরদুপুর ১১:৪২
    আছরবিকাল ২:৫৬
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:২১
    এশা রাত ৬:৩৭

স্বত্ব @২০২০ দেশ

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ