1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৫২ অপরাহ্ন

শুভ জন্মদিন চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর

রফী হক
  • আপডেট টাইম :: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২০

বেঁচে থাকলে আজ ৮৯-তে পা দিতেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর । মাত্র দু’দিন আগে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, চিরতরে ! তিনি একটি ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, পিকাসোর থেকে একদিন হলেও বেশি বাঁচতে চান । বিশ্বখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসো বেঁচেছিলেন প্রায় ৯১ বছর । পরমেশ্বর তাঁকে সেই আয়ু দিলেন না । মানুষকে অনেক ইচ্ছে পূরণ না করেই চলে যেতে হয় । তাঁর জন্মদিনকে স্মরণ করে তাঁরই আত্মজীবনী ‘আমার জীবন ও অন্যান্য’ গ্রন্হ থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি । আমার ধারণা, এ লেখাটি পড়লে বর্তমান প্রজন্মের শিল্পী ও শিল্পানুরাগী পাঠকবৃন্দ শিল্পী মুর্তজা বশীরকে নতুন করে জানবেন । শুধু তাই নয়— নবীন শিল্পীদের লেখাটি অনুপ্রাণিত করবে বলেও বিশ্বাস করি । তাঁর ৮৯ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই ।


আমার জীবন : মূর্তজা বশীর

“…আমি আমার মায়ের মুখে শুনেছি, আমার জন্মের দুদিন আগে পড়ে গিয়েছিলেন । ফলে গর্ভবাস থেকে আমার একটি হাত বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, তাই দুরাত দুদিন আমার মা না পারতেন বসতে, না পারতেন শুতে, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন । সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ডা: বোস বলেছিলেন, প্রসূতিকে বাঁচাতে হলে সন্তানটিকে মেরে ফেলতে হবে । কিন্তু আমার মা তাতে রাজি হননি । তাই কোনোরকম দুষ্টামি করলে মা আমাকে বলতেন : তুই জন্মের আগেও আমাকে জ্বালিয়েছিস, এখনো জ্বালাচ্ছিস । শুনে মনে কষ্ট পেতাম । এর ফলে আমাকে একধরণের নি:সঙ্গতা ছেলেবেলাথেকেই ঘিরে ফেলে, যা থেকে আমি এখনো মুক্তি পাইনি…
.
‘…বাবা বলে যাঁকে আমরা জানতাম, তিনি হলেন টুপি পরিহিত ছোট্ট দাড়িওয়ালা একটি লোক যিনি নিজের লাইব্রেরি ঘরে বইপত্রের মধ্য মগ্ন থাকতেন । তাঁর কাছে যাওয়ার সুযোগ তেমন ঘটত না । নামাজ পড়ার সময় তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তাম । এটুকুই । তবে মাসের প্রথম দিন তিনি তাঁর বেতনের টাকা টেবিলে রাখতেন এবং ছেলেদের বলতেন, যার যা ইচ্ছে নিতে । আমরা যখন ইচ্ছে মতন টাকা নিয়ে বেরোতাম তিনি সেই টাকাগুলো আমাদের হাত থেকে নিয়ে নিতেন । প্রত্যেকটি ছেলের নাম লেখা কাঠের বাক্স ছিল, সেখানে তিনি টাকাগুলো রাখতেন ।
.
‘প্রতি রবিবার দুপুরের খাবার পিতার সঙ্গে আমরা ভাইয়েরা ডাইনিং টেবিলে খেতাম । সেদিন বাড়িতে একটা আনন্দ উৎসবের মতো ছিল । আমার মা সুন্দর ফুলের কলি বা ফুটন্ত ফুলের মতো সাদা টেবিল ন্যাপকিন দিয়ে বানিয়ে গ্লাসে সাজাতেন । প্লেটের একধারে থাকত ছুরি, কাটাচামচ, টেবিল চামচ এবং প্রেটের মাথার দিকে থাকত স্যুপ খাবার গোল চামচ । সেদিন আমাদের বাড়িতে ইংলিশ ফুড হতো । খানসামা গলাবন্ধ সাদা কোট মাথায় টারবান পরে আমাদের পরিবেশন করত ।
.

‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র বলে ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে একধরণের আত্মগরিমা এবং সেই সঙ্গে কিছুটা ঔদ্ধত্য ছিল । একবার ক্লাস টেনে পড়ার সময় মুকুল ফৌজের মেয়েদের প্যারেডে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে সাইকেল চালিয়ে লাইন ভেঙ্গে দিয়েছিলাম । স্কুলের মাঠের পাশে একজন সাব-রেজিস্ট্রার বাস করতেন । তা দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘খোকা তুমি আজ যা করলে অন্য কেউ হলে তা ছিল ক্ষমার অযোগ্য । কিন্তু তোমার বাবা চিরদিন বেঁচে থাকবেন না । তখন কেউ তোমাকে রেহাই দেবে না । সেদিন তাঁর কথায় আমি যে স্বপ্নের জগতে বিচরণ করতাম তা থেকে পতিত হলাম ।
.
‘আমার নানা ধরণের কীর্তিকলাপের কথা শুনে তিনি (পিতা) একদিন আমাকে ডেকে বললেন : ‘শোনো, তোমার ইংরেজি গ্রামার বইতে তুমি পড়েছ না— এমিন্যান্ট ইনিম্যান্ট, প্রিন্সিপাল প্রিন্সিপল, নটোরিয়াস ফেমাস । তুমি আমার সন্তান আইদার নটোরিয়াস অর ফেমাস, ডোন্ট বি এ মিডিওকার ।
.
‘বাবা চেয়েছিলেন আমি আলিগড়ে পড়াশোনা করি । তখনকার দিনে মুসলিম সমাজে এটা ছিল একধরণের বাসনা । কিন্তু যখন আর্ট কলেজে ভর্তির কথা বলি, তিনি বিরোধিতা করেন । তিনি বলেন, তিনি প্যারিসে ছিলেন, তিনি দেখেছেন আর্টিস্টদের জীবন অত্যন্ত কষ্টের ‌এবং অনিশ্চয়তায় ভরপুর । তাঁর সন্তান অভুক্ত বা অনাহারে থাকবে, দুঃখকষ্টে দিনযাপন করবে, এটা পিতা হিসেবে তাঁর কাছে অশোভনীয় ।
.
‘আমার সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে দেখে তিনি বললেন রবীন্দ্রানাথের প্রতিষ্ঠান শান্তিনিকেতনে পড়ার জন্য । …আমি ঢাকা আর্ট কলেজে পড়ার জন্য জেদ করলাম । প্রথম কয়েকদিন আমার সঙ্গে কথা বললেন না, তাঁর সঙ্গে নামাজ পড়তে ডাকলেন না । দুই-তিন দিন পর তিনি আমার হাতে ভর্তির হওয়ার জন্য টাকা দিয়ে তার সঙ্গে লাইব্রেরি ঘরে নিয়ে গেলেন । আলমারি খুলে ল্যুভর মিউজিয়ামের ওই দুটো নিষিদ্ধ ফল আমার হাতে তুলে দিলেন । বললেন, এই বই দুটি এতদিন ছিল আমার, আজ থেকে তোমার ।
.
‘তিনি মনে করেছিলেন এই নগ্নিকা রমণীরা আমার কাছে দৃষ্টিনন্দন রমণীরূপে ধরা দেবে, কামনাজর্জরিত নগ্ন ছবি হিসেবে প্রলুব্ধ করবে না…।”
.

চাইতাম লোকে বলুক মুর্তজা বশীরের বাবা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র ছেলে মুর্তজা বশীর, এই পরিচয় আমার কাম্য ছিলো না । আমি বরং চাইতাম লোকে বলুক মুর্তজা বশীরের বাবা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ । তাই নামের শেষ থেকে ‘উল্লাহ্’ মুছে দিয়ে আমি মুক্তির স্বাদ অনুভব করেছি । এই পারিবারিক চিহ্নটি মুছে ফেলা বাবু সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি । অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন ।
.

আমার একটা চিঠি এসেছিল । বাবু তখন তাঁর লাইব্রেরি ঘরে বইয়ের পাতায় নিমগ্ন । ডাক পিওন আমার একটা চিঠি দিলো । চিঠিটি বাবুর সামনে রাখতেই তিনি চোখ বুলিয়ে ফেরত দিলেন । ঘটনাচক্রে তখন আমি সেখানে । হাত বাড়িয়ে চিঠিটি নিয়ে দেখলাম আমার চিঠি । তিনি আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন । আমি অকম্পিত গলায় বললাম, ‘উল্লাহ্’ কেটে দিয়েছি । নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে চাই । তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন । সেই দৃষ্টি এত স্বচ্ছ যে তাকানো যায় না সেদিকে । আপসেই মাথা নিচু হয়ে যায় । সেই মুহূর্তে আমাকে মনে হয়েছিল বিদ্রোহী আওরঙ্গজেব । পিতা শাহজাহানের সমুখে নতজানু । …তবু তিনি আমার নামের বানান সংশোধন করে দিয়েছেন । আমি ম-তে দীর্ঘ-উকার দিতাম— মূর্তজা । তিনি বললেন, মূর্খের বানান দীর্ঘ-উকার হয় । তুমি তো মূর্খ নও । তুমি লিখবে ম-তে হ্রস্ব-উকার দিয়ে— মুর্তজা ।
.

একবার আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম । মাসের প্রথম দিক ছিল । সংসারের সব টাকা মার দেরাজ থেকে নিয়েছিলাম । আর বাবার সুটকেস থেকে আরও কিছু টাকা । লক্ষ্ণৌ চলে গিয়েছিলাম । কিন্তু আবার ফিরে এসেছিলাম । বাসার জন্য মন খারাপ হয়েছিলো সাংঘাতিক । বাবু আরাম কেদারায় বসে বই দেখছিলেন । আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন । আমার ভীষণ ভয় করছিল । হয়তো তিনি মারবেন । কিন্তু তিনি মারলেন না ।
.

ধীর গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় গিয়েছিলে?’
মাথা নিচু করে জবাব দিয়েছিলাম, লক্ষ্ণৌ পর্যন্ত ।
আমার জবাবে তিনি ক্ষুণ্ন হলেন । বললেন, আগ্রায় গিয়ে তাজমহল তো দেখতে পারতে ।
.

তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, আমার ছেলে তুমি । নটোরিয়াস বা ফেমাস হবে । মাঝামাঝি কিছু হও, আমি তা চাই না” ।…

 

লেখকঃ সম্পাদক, শিল্পপ্রভা  
————————————-
তথ্যসূত্র : আমার জীবন ও অন্যান্য / মুর্তজা বশীর
বেঙ্গল পাবলিকেশনস লিমিটেড

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৪:৪৭
    সূর্যোদয়ভোর ৬:০৩
    যোহরদুপুর ১১:৪২
    আছরবিকাল ২:৫৬
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:২১
    এশা রাত ৬:৩৭

স্বত্ব @২০২০ দেশ

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ