1. ayanabirbd@gmail.com : deshadmin :
  2. hr.dailydeshh@gmail.com : Daily Desh : Daily Desh
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১২:৫৯ অপরাহ্ন

২৫ থেকে ২৬, রাতের আঁধার কেটে আলোর ঠিকানা

সালেহ আহমদ
  • আপডেট টাইম :: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২০

সালেহ আহমদ


পঁচিশে মার্চ, ১৯৭১। আমি তখন ঢাকায় থাকি। আমরা তিন ভাই, দুই বোন, বাবা, মা আর কাজের সাহায্যকারী আসিয়ার মা। শহরে কানা ঘুষা চলছিল, কিছু একটা হতে পারে। কী হতে পারে সেই বিষয়ে তেমন কোন ধারনাই ছিলো না। মার্চ মাসের রাত গুলো আমাদের দেশে না শীত না গরম এই রকম অবস্থা থাকে। বয়স তখন একুশ মাত্র, বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ শেষ হয়েছে আমার।

বঙ্গবন্ধু কার্যত দেশ চালাচ্ছিলেন। তার মুখের হুকুমে দেশের সব মানুষ চলতো। বাঙালি সরকারি কর্মচারিরা তার মুখের জবানকে নির্দেশ মনে করতো। সে ভাবেই পুরো বাংলাদেশ চলছিল। নতুন চিন্তা, নতুন স্বপ্নে বিভোর আমরা। নতুন বাঙালি জাতি হিসাবে নতুন দেশের জন্ম হচ্ছে।আমাদের তরুনদের মধ্যে তখন অন্য রকম এক আবেগ কাজ করছিল। আমার স্কুল ও কলেজ বন্ধু কাউসারুল হক, টি এন্ড টি কলোনিতে থাকো। আমার বাসা বি-১/ডি-২,মতিঝিল কলোনি। দুজনের বাসার দূরত্ব ফার্লং দুই হবে। একবার রাস্তা ধরে হাটতে হাটতে আমার বাসায় আসি আবার চলে যাই টি এন্ড টি কলোনি। এই ভাবে যাওয়া আসা করতে করতে রাত প্রায় এগারোটা বেজে গেলো। পরে আমিই ক্ষ্যান্ত দেই। কারন এর চেয়ে বেশী রাত হলে বাসায় বকাঝকা করার সম্ভাবনা ছিল। বাসায় এসে মুখ হাত ধুয়ে একাই খাওয়া দাওয়া করলাম। আসিয়ার মা জেগে থাকতো আমার জন্য। উনি আমাকে বড় ভাই ডাকতো, ছোট ভাই বোনদের নাম ধরে ডাকতো। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আসিয়ার মা আমাদের সাথেই ছিল। বাবার অবসরের পর সে সিলেট চলে যায়, পরে আবার ঢাকায় আমাদের সাথেই থাকে। মদনগন্জেও আমার সংসারে ছিলো। আমি তাঁকে মহীয়সী নারী হিসাবে জ্ঞ্যান করি। রাত হয়তো বারোটা হবে। হঠাৎ দু-একটা গুলির আওয়াজ পেলাম। মনে করলাম হয়তো কেউ বোমা ফোটাচ্ছে। আমি জীবনে কোন দিন গুলির আওয়াজ শুনিনি। তাই অরকমদু একটি ঠুস-ঠাস শব্দ শুনে তাই আমার ওরকম কিছু মনে হয়নি। আমাদের বাসা একেবারে কমলাপুর রেল স্টেশনের লাগোয়া। রেলস্টেশন থেকে বের হলে প্রথম বাসাটাই আমাদের।

একটা দুটো গুলির আওয়াজ কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্রমাগত হতে থাকে। আমরা বাসার সবাই সবচেয়ে নিরাপদ যায়গা বড় বাথরুম আর পাকঘরের কোনায় একটা মাদুর বিছিয়ে বসে থাকি। ঢ্যাঁ-ঢ্যাঁ করে গুলির আওয়াজ বাড়তে থাকে। আমি ভয়ে নিথর হয়ে যাই। বাবা মা ভাই বোন আসিয়ার মা সবাই একই মাদুরে জড়ো সড়ো হয়ে বসে থাকি। যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছি। আসিয়ার মার বাড়ি ফরিদপুর। তখন আব্বাদের সরকারি বাসার সঙ্গে কাজের মানুষদের জন্যও কোয়ার্টার দেয়া হতো। আসিয়ার মাকে সার্ভেন্ট কোয়ার্টার দেয়া হয়। আসিয়ার মা থাকতো আমাদের সাথে আর সার্ভেন্ট কোয়ার্টার ভাড়া দিত মাসিক বিশ টাকা। আমরা দিতাম পাঁচ টাকা। এ-ইই ছিল তাঁর আয়। ক্রমাগত গোলা গুলির শব্দে বাক রুদ্ধ হয়ে পড়ি। আমার মানসিক চাপ এতই বেড়ে যায় যে আমি ছোট টয়লেটে যেতে বাধ্য হই। পরে কোন ভাবে আবার বিছানো মাদুরের কাছে হামাগুড়ি দিয়ে আসি। গোলা-গুলি কিছুতেই থামছে না। এর মধ্যে আসিয়ার মা রান্না ঘরে গেলো। ষ্টোর রুম থেকে পুরানো চালের বস্তা বের করলো। পাকঘরের নিচের কলে চটের বস্তাটা ভালো করে ভিজালো। তারপর এই বীর নারী আমাদেরকে বাঁচানোর জন্য পাকঘরের জানালার স্প্রিং এ ভেজা ছালা পর্দার মতো ঝুলিয়ে দিলো। বললো,’আর ডরের কিছু নাই।গুল্লি আইলে ভিজা ছালায় আটকাই যাইবো।’ আমার মনে হলো আমরা যেন এই রাতে বেঁচে যাবো।

আমাদের বাসায় ঢোকার দরোজা দুটো। একটা সোজা ড্রইংরুমে, আর অন্যটা লিভিং রুমে ঢোকার। আমরা নীচ তলায় থাকি। সামনে বড় বারান্দা। বারান্দার কোনায় দুই ফুট বাই পাচ ফুট বাগান করার যায়গা। সেখানে সারা বছর অফিস ফুল ফোটে। হঠাৎ আমার আম্মা সচকিত হয়ে উঠলেন। দ্রিম দ্রাম গুলাগুলি আরো বাড়ছে। বৃষ্টির মতো দ্রিম দ্রাম। একসম বিকট একটা শব্দে পুরো বিল্ডিংটা কেঁপে উঠলো। মনে হলো মিলিটারিরা আমাদের বিল্ডিংটাকেই তাক করে মারছে। আম্মা দাড়িয়ে গেলেন। আমি বললাম, ‘কী হলো আম্মা বসে থাকো চুপ করে।” আম্মা আমার কোন অনুরোধ না শুনে রান্নাঘরে গেলেন। স্টোর রুমে কোন জানালা নেই। বাতি জ্বালিয়ে চাচার দেয়া বাড়ি থেকে আনা দা বের করলেন। সোজা ড্রইং রুমে দরোজা খুললেন ক্রলিং করে। আমিও পিছু নিলাম। কারন আমি ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি, অফিস ফুলের মাটি খুড়ে বাঁশ গেড়ে ওখানে বাংলাদেশের পতাকা লাগানো আছে। ভোরের আগে ওটা না সরালে নির্ঘাত মিলিটারির হাতে মৃত্যু। দরোজা খুলে প্রথমেই পেছন থেকে আমাকে একটা লাথি মেরে সরিয়ে দিলেন। “যা ভিতরে যা। জোয়ান ছেলে দেখলেই গুলি করবে।” আমি দেয়ালের আড়ালে চলে যাই। আমার মা দা দিয়ে চিকন বাঁশটাকে দুই কোপে কাটতে সক্ষম হোন। বাংলাদেশের পতাকা খুলে যত্নে ঘরে নিয়ে আসেন। আমরা আবার যেন জীবন ফিরে পেলাম।

প্রচন্ড গোলাগুলিতে আমাদের জীবন যখন প্রায় ওষ্ঠাগত তখন চান মিয়ার দোকানের ওখানে পীরের মাজার সংলগ্ন মসজিদ থেকে আজানের আওয়াজ আসলো। বুঝতে পারলাম ভোর হচ্ছে। গোলাগুলির আওয়াজ ততক্ষণে থেমে গেছে। আমার বাবা এমনি পরহেজগার মানুষ, ঘরে একটা রেডিও নেই। ড্রইং রুমের পর্দা একটু সরিয়ে দেখলাম, রাস্তায় মিলিটারি টহল দিচ্ছে। বি আর টি সির বাস ডিপো এতিমের মতো পড়ে আছে। পৃথিবীতে কী প্রলয় কান্ড ঘটে গেলো কিছুই বুঝতে পারছিনা।

কিন্তু ২৬ মার্চ, ৭১ আমাদের জন্য অন্য রকম এক দিন নিয়ে এলো। সাহসে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠলাম আমরা। সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের আলোকিত শুভেচ্ছা। ঘরেই থাকুন। নিরাপদে থাকুন।  ভাল থাকুন সবাই।

 


@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর

@desh.click এর অনলাইন সাইটে প্রকাশিত কোন কন্টেন্ট, খবর, ভিডিও কিংবা ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দন্ডনীয় অপরাধ।

বিশ্বে করোনা ভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
৪০৬,৩৬৪
সুস্থ
৩২২,৭০৩
মৃত্যু
৫,৯০৫
সূত্র: আইইডিসিআর

বিশ্বে

আক্রান্ত
৪৫,৫৭৬,৯৯০
সুস্থ
৩০,৫৩৮,১৯৪
মৃত্যু
১,১৮৮,৭৮৭

নামাজের সময়সূচীঃ

    Dhaka, Bangladesh
    শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ৪:৪৭
    সূর্যোদয়ভোর ৬:০৪
    যোহরদুপুর ১১:৪২
    আছরবিকাল ২:৫৬
    মাগরিবসন্ধ্যা ৫:২০
    এশা রাত ৬:৩৭

স্বত্ব @২০২০ দেশ

সাইট ডিজাইনঃ টিম দেশ