ঢাকাবুধবার , ৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
  1. অন্য আকাশ
  2. আইন আদালত
  3. আবোল-তাবোল
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপসম্পাদকীয়
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. কলাম
  8. ক্যারিয়ার
  9. খেলার মাঠ
  10. গ্যাজেট
  11. জাতীয়
  12. টাকা-আনা-পাই
  13. দেশ পরিবার
  14. দেশ ভাবনা
  15. দেশ সাহিত্য

১০ লাখ মানুষের গলার কাঁটা ভবদহ স্লুইসগেট

মফস্বল সম্পাদক
সেপ্টেম্বর ৮, ২০২১ ৩:২৮ অপরাহ্ণ


মনিরামপুরের ভবদহ অঞ্চলের ৯৬ টি গ্রামের ১০ লক্ষ মানুষের গলার কাঁটা এখন ভবদাহ স্লুইসগেট যশোর ও খুলনার মনিরামপুর সহ ৩৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশার নাম ভবদহ স্লুইসগেট। ভবদহ সমস্যার সমাধানের নামে প্রজেক্টের পর প্রজেক্ট গ্রহণ করা হলেও হয়নি কাজের কাজ। বর্তমানে ভবদহ স্লুইসগেটের ২১ কপাটের মধ্যে ১৮ কপাটই পলি জমে বন্ধ।



স্থানীয়দের ধারণা, সংস্কার না হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে ভবদহ অঞ্চল তলিয়ে যাবে। পলি পড়ে এই অঞ্চলের মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্য হারিয়েছে। জোয়ারের সময় হাঁটুপানি হলেও ভাটার সময় পুরোটাই শুকিয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে এই গেট দিয়ে বিল কেদারিয়া, বিল কপালিয়া ও বিল আড়পাড়াসহ যশোর ও খুলনা এলাকার মোট ২৭টি বিলের পানি নিষ্কাশন হবে কীভাবে সেই প্রশ্ন ওই অঞ্চলের মানুষের। তাদের শঙ্কা, আবারও ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হবে যশোরের তিনটি উপজেলার ১০ লক্ষাধিক মানুষ। প্রতি বর্ষা মৌসুমে পানির কাছে হেরে যাচ্ছে ভবদহ অঞ্চলের মানুষ।খেতের ফসল, ঘেরের মাছ সবই কেড়ে নিয়েছে এই পানি। কেড়ে নিয়েছে থাকার জায়গাটুকুও। বর্ষা মৌসুমে মানুষ মারা গেলে কবর দেওয়ার জায়গাও পাওয়া যায় না। সর্বগ্রাসী ভবদহ ভেঙেচুরে চুরমার করে দিয়েছে লাখো পরিবারের সাজানো-গোছানো গৃহস্থালি। পক্ষান্তরে সরকারি অর্থ লোপাটের কারখানা হিসেবে পরিচিত হয়েছে ভবদহ।


জানা গেছে, জয়েন্ট পাকিস্তান আমলের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ভবদহ সুইচগেট। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইযুব খানের শাসনামলে সবুজ বিপ্লব বাস্তবায়নের জন্য যশোরের মনিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর ও সদর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় এক লাখ ২৮ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ততার হাত থেকে রক্ষার জন্য ২৭টি বিলের পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজনে ভবদহ স্লুইসগেট নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। টেকা-মুক্তেশ্বরী নদীর ওপর ভবদহ নামক স্থানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পানি উন্নয়ন বোর্ড ভবদহ স্লুইসগেট নির্মাণ করে (১৯৬২-৬৩)। তখন এলাকায় ব্যাপক ফসল হতে থাকে। ১৯৮২ সালে প্রথম স্লুইসগেটে জোয়ারের পানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নদীর তলদেশে পলিমাটি জমতে থাকে। তখন থেকে শুরু হয় ব্যাপক ফসলহানি। রাস্তাঘাট ও স্কুল-কলেজে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে।


জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে এলাকার মানুষ ১৯৯৭ সালে নদীর বেড়িবাঁধ কেটে জোয়ারের পানি পাশের ভায়না বিলে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সরকার ভবদহে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) প্রকল্প গ্রহণ করে।


ফলে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ভবদহে জলাবদ্ধতা হয়নি। কিন্তু পরের তিন বছর আবার জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ২০০৭ সালে বিল খুকসিয়ায় সরকার ফের টিআরএম চালু করে। এর পরের কয়েক বছর আবার জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পায় ভবদহবাসী। সর্বশেষ গত ৪/ বছর ভবদহ অঞ্চলে আবার জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বর্তমানে ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে এলাকার কোনো বিলে টিআরএম কার্যকর নেই। ফলে বর্ষা মৌসুমে ভবদহে শত গ্রাম জলমগ্ন হয়ে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার হেক্টর জমির আমন নষ্ট হয়ে যায়। পানিবন্দি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে ভবদহ অঞ্চলের সার্বিক জীবনব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবসহ অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হয়।


অনুসন্ধানে জানা যায়, ভবদহ অঞ্চলের মানুষের আন্দোলনের ফলে ১৯৯৪ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় যশোর-খুলনা পানি নিষ্কাশন প্রকল্প (কেজিডিআরপি) গ্রহণ করা হয়। ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৫৭ কোটি টাকা। সমুদয় অর্থ ব্যয় হওয়ার পরও জলাবদ্ধতার নিরসন হয়নি। অভিযোগ আছে, ওই অর্থের বড় অংশই লুটপাট হয়। পর্যায়ক্রমে ২০০১-০২ অর্থবছর থেকে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে এসে পানি উন্নয়ন বোর্ড বরাদ্দ করে ২৯ কোটি টাকা, ২০০৭ সালে ৫৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং ২০১০ সালে ৭৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। দফায় দফায় টিআরএমসহ ছোট ছোট প্রজেক্টে কোটি কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়। চার-পাঁচ বছর আগে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ করার পর থেকে ভবদহ এলাকার ভুক্তভোগী মানুষ সামান্য আশার আলো দেখতে পেলেও কোনো সমাধান হয়নি। সর্বশেষ ভবদহ গেটের উত্তর পাশে শ্রীনদী ড্রেজিংয়ে চলতি বছর এক কোটি সাত লাখ টাকার কাজ চলছে। তবে দায়সারাভাবে কাজ করার ফলে তা কোনো কাজেই আসছে না।


ভবদহ পানি নিষ্কাশন কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবীর জাহিদ জানান, দীর্ঘ আন্দোলনের পর টিআরএম প্রকল্প অনুমোদিত হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ওই অঞ্চলকে জলাশয় দেখিয়ে টিআরএম বাতিল করে দেয়। ভবদাহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে আসছে বর্ষায় যশোর সদরের কিছু অংশসহ পুরো ভবদহ অঞ্চল তলিয়ে যবে। আর ভবদহ সমস্যা জিইয়ে রেখে সরকারি অর্থ লোপাট করা হচ্ছে। তাই বস্তবসম্মত কার্যকর প্রজেক্ট গ্রহণ এবং একইসঙ্গে লুটপাটের তদন্ত করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।


ভবদহ সংগ্রাম কমিটির নেতা ও পানি বিশেষজ্ঞ কমরেড গাজী হামিদ জানান, ভবদহ স্লুইসগেটের কার্যকারিতা হারিয়ে গেছে। এই গেটের কারণে নদনদী ও খালবিলের পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। এ কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ভবদহ স্লুইসগেট সম্পূর্ণভাবে তুলে দিয়ে ভবদহের আশপাশের সব নদী খনন করে উজানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং বিল কপালিয়াসহ খালবিলে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) চালু করলে অথবা আমডাঙ্গার খালপ্রসারিত করা হলে ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।


পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, টিআরএম বাদ দিলে পানি নিষ্কাশিত হবে না, এমন নয়। আমডাঙ্গা খাল খনন করে পানি নিষ্কাশন করা যাবে। তাছাড়া টেকা ও হরিহর নদী খনন করলেও পানি নিষ্কাশন করা যাবে। তবে গত বছর ১২ কিলোমিটার খনন করার দরকার ছিল, কিন্তু বাজেট পাই ১.৮ কিলোমিটার খননের। ওই অঞ্চলের সবকটি নদী ও খাল খনন করার প্রস্তাব পাঠানো হবে। প্রস্তাব পাঠানোর পর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ফাইল ছেড়ে দিলে এক বছরের মধ্যে কাজ শুরু করা যাবে।

প্রতিবেদক

সর্বশেষ - সোশ্যাল মিডিয়া