ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৫ জুলাই ২০২১
  1. অন্য আকাশ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন আদালত
  4. আবোল-তাবোল
  5. উদ্যোক্তা
  6. উপসম্পাদকীয়
  7. এক্সক্লুসিভ
  8. কলাম
  9. ক্যারিয়ার
  10. খেলার মাঠ
  11. গ্যাজেট
  12. জাতীয়
  13. টাকা-আনা-পাই
  14. দেশ পরিবার
  15. দেশ ভাবনা
পুকুরে চিংড়ি পোনা উৎপাদনে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন

সাদা সোনায় সম্ভাবনার হাতছানি

সুনীল কুমার দাস, ব্যুরো প্রধান (খুলনা)
জুলাই ১৫, ২০২১ ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ


সাদা সোনা খ্যাত গলদা চিংড়ির পোনা উৎপাদন এবার হ্যাচারিতে নয়-পুকুরেই উৎপাদন করা যাবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে গলদা চিংড়িসহ কয়েকটি দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষ নিয়ে গবেষণা করে এই সফলতা পেয়েছেন।


দেশীয় আবহাওয়ার উপযোগী করে বৃষ্টির পানির গুণাগুণ রক্ষার পর বিনা অপচয়ে বা পুনরায় পানি ব্যবহার না করেই এ পদ্ধতিতে মাছ চাষের লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তারা। একই সাথে গবেষকরা মাছের এমন একটি সাশ্রয়ী মূল্যের শর্করা প্রধান খাদ্য উদ্ভাবন করেছেন যাতে মাছের প্রজাতি ভিত্তিক প্রকৃত স্বাদ, বর্ণ ও গন্ধ অক্ষুণ্ন থাকে। আর্জাতিক সংস্থা সলিডার্ড এশিয়া ও ওয়ার্ল্ড ফিসের সহযোগিতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিন এবং নেদারল্যান্ডের ওয়াগিনন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকবৃন্দের যৌথ উদ্যোগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পিএইচডি, স্নাতকোত্তর ও স্নাতক পর্যায়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। গবেষক দলের প্রধান ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মোঃ নাজমুল আহসান এবং সহযোগী গবেষক হিসেবে ছিলেন বিশ্ববিদ্যারয়ের ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষক এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সুদিপ দেবনাথ ও এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর শাহিন পারভেজ।

ইতিমধ্যেই গবেষণালদ্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুলনার উপকূলীয় বটিয়াঘাটা উপজেলার ছয়ঘরিয়া গ্রামের পুকুরে গলদা চিংড়ির পোনা উৎপাদনের লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফল হয়েছেন। এরফলে পোনার অভাবে গলদা চিংড়ি চাষ যে সংকটের মুখে পড়েছিল এখন সেটি পুরনের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার আশা জাগিয়েছে। পুকুরে গলদা চিংড়ির পোনা (পিএল) উৎপাদন এবং তা দিয়ে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারিত হলে প্রাকৃতিক ও হ্যাচারি উৎসের উপর নির্ভরতা কমবে। অপরদিকে পুকুরে গলদা চিংড়ির পোনা উৎপাদন সম্ভব হলে এ অঞ্চলের শত কোটি পোনার চাহিদার সংকট পূরণ হবে।ফলে চাহিদা মাফিক পোনা সরবরাহ সম্ভব হওয়ায় বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাদাসোনা চাষের চিত্র। একই সাথে পোনার মূল্য ও সংগ্রহের খরচ হ্রাস এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে যার ফলে দেশের চিংড়ি রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অপরদিকে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক টিম বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে গলদা চিংড়িসহ কয়েকটি দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষ নিয়ে গবেষণা করে সফলতা পেয়েছেন। দেশীয় আবহাওয়ার উপযোগী করে বৃষ্টির পানির গুণাগুণ রক্ষা করে বিনা অপচয়ে বা পুনরায় পানি ব্যবহার না করেই এ পদ্ধতিতে মাছ চাষের এ লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তারা। একই সাথে গবেষকরা মাছের এমন একটি সাশ্রয়ী মূল্যের শর্করা প্রধান খাদ্য উদ্ভাবন করেছেন যাতে মাছের প্রজাতিভিত্তিক প্রকৃত স্বাদ, বর্ণ ও গন্ধ অক্ষুণ্ন থাকে।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে সলিডার্ড এশিয়া ও ওয়ার্ল্ড ফিসের সহযোগিতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিন এবং নেদারল্যান্ডের ওয়াগিনন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকবৃন্দের যৌথ উদ্যোগে খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক, পিএইচডি, স্নাতকোত্তর ও স্নাতক পর্যায়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রকল্পের প্রধান ইনভেস্টিগেটর ও সমন্বয়কারী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মোঃ নাজমুল আহসান জানান, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলবায়ুতে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার উন্নয়নে ইন্টার ডিসিপ্লিনারি গবেষণার অপরিহার্যতাকে সামনে রেখে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে সলিডার্ড এশিয়া ও ওয়ার্ল্ড ফিসের সহযোগিতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিন এবং নেদারল্যান্ডের ওয়াগিনন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকবৃন্দের যৌথ উদ্যোগে সেন্টার অব এক্সিলেন্স ক্লাইমেন্ট রেসিলেন্স কোস্টাল ফুড সিস্টেম প্রতিষ্ঠা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। যার আওতায় বিভিন্ন ধরণের প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। করোনার সময়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধকালীন ডিসিপ্লিনের গবেষকদের তত্ত্বাবধানে ছাত্রছাত্রীবৃন্দ এই গবেষণা চালিয়েছেন। তিনি জানান, সারা বাংলাদেশে গত ১০বছর ধরে গলদা পোনা হ্যাচারীর অধিকাংশই বন্ধ রয়েছে।গলদা চিংড়ি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদনে ধস নামায় এবং উপকূলের প্রাকৃতিক উৎস থেকে পোনা আহরণ সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায় চিংড়ি চাষীদের পোনা সংগ্রহে সংকটে পড়তে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ও রপ্তানিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রতিকূলতার কারণে চাষীরাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।এ অবস্থায় তাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিলো-বিকল্প হিসেবে পুকুরের পানিতে গলদা চিংড়ির পোনা উৎপাদন নিয়ে গবেষণা করা এবং এর মাধ্যমে পোনার চাহিদা পূরনে কার্যকরী পদ্ধতির উদ্বাবন করা। চাষীরা তাদের পুকুরে পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারলে তা সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। গ্রামের পুকুরে পুকুরে গলদা চিংড়ির চাষ বাড়লে চাষী আর্থিকভাবে অধিক লাভবান হবেন।
তিনি আরো জানান,আমরা ২০২০ সালের শুরু থেকে এই গবেষণা চালিয়ে পুকুরের পানিতে গলদার পোনা উৎপাদনে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছি। খুলনার উপকূলীয় এলাকা বটিয়াঘাটার ছয়ঘরিয়া গ্রামে পুকুরের জমি লিজ নিয়ে এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। পুকুরের পানিতে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে আমরা কিছু প্রাকৃতিক ও প্রযুক্তিগত কলাকৌশল কাজে লাগিয়েছি। এখানে পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা, অক্সিজেনের উপস্থিতি, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পানির প্রবহতা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্য। প্রাকৃতির পরিবেশ ও লাগসই প্রযুক্তির সমন্বয়ে আমরা গলদা চিংড়ির পোনা উৎপাদনে সাফল্য লাভ করেছি। যা এতদাঞ্চলে গলদার পোনা উৎপাদনে হ্যাচারি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পোনা প্রাপ্যতা সহজলভ্য করবে। আমাদের গবেষণা পুকুরের পোনা দিয়ে এখন কয়েকটি অধিক্ষেত্রে গলদার চাষ হচ্ছে। উৎপাদনকৃত প্রায় সাড়ে ৬লক্ষ পোনা আমরা চাষীদের মধ্যে বিতরণ করেছি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কয়েকটি মিনি পুকুরও রয়েছে।

এছাড়া বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্যোক্তা অনুকূল প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।এখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে মাছ উৎপাদনে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। সেই সাথে নতুন ধরণের লো-কস্ট ফিসফিড উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকৃত স্বাদ, বর্ণ ও গন্ধ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। তিনি আরও জানান,এই প্রকল্পে তারা বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করেছেন। শহরে, শহরতলী বা আগ্রহী চাষী স্বল্প জায়গায় এ পদ্ধতিতে অল্প খরচের মধ্যে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করতে পারবেন। তারা তেলাপিয়া, শিং, কৈ ও টেংরা মাছ নিয়ে কাজ করেছেন। এরমধ্যে টেংরা মাছ ছাড়া অন্য তিনটি মাছের ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য পেয়েছেন। বৃষ্টির পানিতে এই মাছ চাষ হওয়ায় এবং পানির গুণাগুণ রক্ষায় মাছের প্রকৃত স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণ ফিরে পেয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে তাদের তৈরি শর্করাবান্ধব প্রাকৃতিক খাবার ভালো কাজ করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, সাধারণত বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, মাছে বিভিন্ন রোগ দেখা যায় ফলে শতভাগ মাছ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। আমাদের উদ্ভাবিত এ পদ্ধতিতে মাছ মারা যায় না কারণ এখানে এম্যোনিয়ার মাত্রা শুন্যতে থাকে অক্সিজেন সবসময় ৫-৬ এর মধ্যে ছিল। সেই সাথে আমাদের উদ্ভাবিত লো-কস্ট ফিসফিড পানিতে এম্যোনিয়া, অক্সিজেন ও কার্বনের পরিমান ঠিক রাখে। বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক নিয়মে ফিসফিড দিলে এর উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। সাধারণত মাছের খাবার তৈরিতে আমিষজাত এবং গ্রোথজাত উপকরণ বেশি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তারা যে নতুন ফিসফিড তৈরি করেছেন তাতে একদিকে যেমন গ্রোথ হরমোন বা অজৈবিক উপকরণ ব্যবহার করা হয়নি। অন্যদিকে এতে এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পূর্ণ জৈবিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে যাতে মাছের স্বাদ বাড়ায়। সেই সাথে উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় চাষীরা বেশি লাভবান হবে। এছাড়া বৃষ্টির পানিতে কোন আর্সেনিক ও আয়রণ থাকে না। বৃষ্টির পানি ও ডিপ টিউবলের পানির জন্য মাছ পালনের প্রক্রিয়াটা একটু আলাদা। তবে বিষয়টা কৃষক পর্যায়ে খুব একটা সহজ না। এ পদ্ধতিতে চাষের জন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রশিক্ষণের। আমরা এ পদ্ধতিতে মাছ পালনে ম্যানুয়াল তৈরি করছি সেই সাথে কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যও আমরা প্রস্তুত আছি। ডুমুরিয়া উপজেলায় কিছু মাছ চাষীকে আমরা কিছু সমস্যার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছি। যেহেতু এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সেন্টার অব এক্সিলেন্স ফর ক্লাইমেন্ট রেসিলেন্স কোস্টাল ফুড সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা তাই এখানে সব ধরণের উদ্ভাবন ইন্টার ডিসিপ্লিনারী রিসার্চ-এর আওতায় হচ্ছে। যেমন রেইন ওয়াটার হার্ভেস্ট একটি ইনভারোমেন্টাল সাইন্স। তারপর বায়োফ্লিক মাছ চাষে তলানিতে যে খাবার ও মাছের বিষ্ঠার স্তর থাকে সেটাকে বায়োভেজিটেবল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিষ্ঠার স্তর বা স্লাশ দিয়ে আমরা স্লাশ কেক বানিয়ে আমরা আরেকটি ফিসফিড তৈরি করেছি। গবেষণায় নেদারল্যান্ডের ওয়াগিনন বিশ্ববিদ্যালয় কারিগরি এবং সলিডারেট এশিয়া ও খুলনা বিশ^বিদ্যালয় আর্থিক সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, গত একবছর ধরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে ৪টি প্রজাতির দেশীয় মাছ চাষে এই সফলতা এসেছে। নতুন এ পদ্ধতিতে মাছ চাষে মাছের উৎপাদান বৃদ্ধির সাথে সাথে কমবে মাছের উৎপাদন খরচও। যার ফলে আগের চেয়ে অনেক বেশি লাভবান হবে প্রান্তিক মৎস্য চাষীরা। আর বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের নতুন এই পদ্ধতি এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে দাবি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের। তিনি আরো জানান, গবেষণা কাজে আমার সাথে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষক এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সুদিপ দেবনাথ, এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর শাহিন পারভেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি’র ২জন, স্নাতকোত্তর ২জন ও স্নাতকের ২জন মোট ৬জন শিক্ষার্থী এই গবেষণায় সম্পৃক্ত থাকায় তারা প্রায়োগিক গবেষণা সম্পর্কে হাতে-কলমে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। যা ভবিষ্যতে তাদের বহুমুখী গবেষণায় কাজে আসবে।

এ গবেষনা প্রকল্পের কো-ইনভেস্টিগেটর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক মোঃ শাহীন পারভেজ জানান, সলিডারেডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও বাংলাদেশের সহযোগিতায় সেন্টার অব এক্সিলেন্স ফর ক্লাইমেট রেজিলেন্ট কোস্টাল ফুড সিস্টেমের আওতায় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্রান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন এডুকেশন(গেয়ার)-এর অর্থায়নে এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি সহযোগিতায় এ গবেষনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এ্যাকুয়াকালচার প্রোগ্রাম সলিডার্ড এশিয়ার টিম লিডার মঈন আহমেদ জানান, সেন্টার অব এক্সিলেন্স ক্লাইমেন্ট রেসিলেন্স কোস্টাল ফুড সিস্টেম প্রতিষ্ঠা এই প্রকল্পের আওতায় বায়োফ্লক ও গলদা চিংড়ি চাষে টেকনিক্যাল সার্পোট দেন খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষক দল। আমরা গবেষণার জন্য আর্থিক সহযোগীতা করেছি।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পুকুরের পানিতে গলদার পোনা উৎপাদনে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন।যা এতদাঞ্চলে গলদা রেণু উৎপাদনে হ্যাচারি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রেণু উৎপাদনে যুগান্তকারী উদ্ভাবনা। সেইসাথে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে দেশীয় মাছ চাষের যে পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে তাতে অল্প খরচের মধ্যে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা যাবে। গবেষণায় তেলাপিয়া, শিং, কৈ ও টেংরা মাছ নিয়ে কাজ করে টেংরা মাছ ছাড়া অন্য তিনটি মাছের ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য পেয়েছেন গবেষক দল। বৃষ্টির পানিতে এই মাছ চাষ হওয়ায় এবং পানির গুণাগুণ রক্ষায় মাছের প্রকৃত স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণ ঠিক থাকছে। তবে এক্ষেত্রে গবেষকদের তৈরি শর্করাবান্ধব প্রাকৃতিক খাবার মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভালো কাজ করেছে। এর ফলে মাছ চাষে উৎপাদন খরচও অনেক কম হবে। যার ফলে চাষীরা লাভবান হবেন।
খুলনা বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাজ কুমার বিশ্বাস জানান, খুলনা বিভাগে মোট ০১’লাখ ০৫’হাজার ৬৩৪টি গলদা চিংড়ির রেজিষ্ট্রার খামার রয়েছে। যেখানে ৬৫ হাজার ৭৭২ হেক্টর জমিতে গলদা চিংড়ি চাষ হচ্ছে। আর এসব খামারে প্রায় ১১৩’কোটি ৭২ লক্ষ গলদা পোনার চাহিদা রয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এ চাহিদার বিপরীতে সরকারী-বেসরকারী মিলে দেশে গলদা চিংড়ির হ্যাচারী রয়েছে মাত্র ০৯টি। যারমধ্যে খুলনায় ০৩টি, সাতক্ষীরায় ০২টি, বাগেরহাটে ০১টি, যশোরে ০১টি, নড়াইলে ০১টি, মাগুরায় ০১টি ও কুষ্টিয়ায় ০১টি। এসব হ্যাচারীতে সরকারীভাবে ২.২১ লাখ ও বেসরকারীভাবে ১৫ লাখ মোট ১৭.২১ লাখ গলদা চিংড়ির পোনা(পিএল) উৎপাদিত হচ্ছে। যারফলে বিপুল পরিমান পোনার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে এ অঞ্চলে। আর এসব পোনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এমনকি ভারত থেকেও চোরাই পথে এনেও চাহিদা মেটাচ্ছে চাষীরা। ফরে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা প্রতিবেশী দেশে চলে যাচ্ছে। যদি আমাদের এ অঞ্চলে পোনা উৎপাদন করা যায় তাহলে এই বিপুল পরিমান পোনার ঘাটতি মেটানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, আমরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাথে যোগাযোগ করেছি এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে সমস্যা যেটা হয়, সেটা হলো গবেষণার পরিবেশ আর মাঠের চিংড়ী ঘেরের পরিবেশ একই রকম থাকে না। গবেষণা পর্যায়ে সবকিছুর পরিবেশ থাকে গবেষকদের নিয়ন্ত্রণে আর মাঠ পর্যায়ে পরিবেশ থাকে মৎস্য চাষীদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে।কারণ সেখানে পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ থাকে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাপ্যতাসহ বিভিন্ন বাহ্যিক বিষয়ের উপর। তাই মাঠ পর্যায়ে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা-নীরিক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগ না করলে এ বিষয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না। যেহেতু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এখনও তাদের উদ্বাবিত প্রযুক্তি আমাদের কাছে হস্তান্তর করেনি তাই মাঠ পর্যায়ে আমরা পরীক্ষা করতে পারিনি। তবে পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে মাঠ পর্যায়ে গ্রহনযোগ্য হলে আমরা বিষয়টি অবশ্যই দেশব্যাপী কৃষকদের মাঝে প্রযুক্তি পৌছে দেয়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব। সেইসাথে যদি অধিকতর পরীক্ষা নিরীক্ষার পর মাঠ পর্যায়ে সফল হয় তাহলেও প্রান্তিক মৎস্য চাষীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তবে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে এখনও কাজ শুরু করেনি বলেও জানান তিনি।

খুলনা মৎস্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আবু ছাইদ জানান, খুলনাঞ্চলে গলদা চিংড়ির যেসব হ্যাচারী আছে সেগুলো তেমনভাবে সফল না এবং চাহিদা অনুযায়ী পোনা উৎপাদন করতে পারছে না। পোনার সংকটের কারণে এতদাঞ্চলের গলদা চিংড়ি চাষ হুমকির মুখে পড়েছে। দেশের অন্যান্য স্থান থেকে গলদা চিংড়ির পোনা(পিএল) চাষের জন্য আনতে হচ্ছে। এতে করে চাষীদের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যে কারনে কাঁচামালের অভাবে ইতিমধ্যেই অনেকগুরো রপ্তানী প্রক্রিয়াকরন কারকানাও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পোনা সংকটে উৎপাদন কম হওয়ায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের গলদা চিংড়ি রপ্তানীতে। গবেষকদের এই প্রযুক্তি মাঠ পার্যায়ে সম্প্রসারন করা গেলে একদিনে যেমন পোনা সংকট সমাধান হবে তেমনি উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশের রপ্তানী বানিজ্যে ব্যাপক সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে বলেও তিনি আশা করেন।

সর্বশেষ - জাতীয়