ঢাকামঙ্গলবার , ৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
  1. অন্য আকাশ
  2. আইন আদালত
  3. আবোল-তাবোল
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপসম্পাদকীয়
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. কলাম
  8. ক্যারিয়ার
  9. খেলার মাঠ
  10. গ্যাজেট
  11. জাতীয়
  12. টাকা-আনা-পাই
  13. দেশ পরিবার
  14. দেশ ভাবনা
  15. দেশ সাহিত্য

রাত হলেই দখলের তোড়জোড়


চট্টগ্রামের বায়েজিদ লিংক রোডে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের পর পরই সেখানে কাটা পাহাড়ের ওপর ও আশেপাশের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত স্থাপনা।



সরোজমিনে গিয়ে দেখা গিয়েছে এসব চিত্র। রাত হলেই দখলের তোড়জোড় শুরু হয় ভূমিদুস্যদের। নামে বেনামে চলে এসব কাজ। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংকরোড সড়ক চট্টগ্রামের সাথে ঢাকার যোগাযোগের ক্ষেত্রে চমৎকার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে । ফলে যানজট থেকে যেমন মুক্তি মিলছে পাশাপাশি এ সড়ক দিয়ে যাতায়াতে সময়ও কম লাগছে । সাধারণ জনগণ উন্নয়নের সুফল পেতে শুরু করলে এ রোডটির চারপাশের জায়গা দখলের হিড়িক শুরু হয়। বেদখলে মরিয়া হয়ে উঠে নানা চক্র।


সড়কটির পাশে বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠছে নতুন নতুন খুঁটি। বানানো হচ্ছে টিনের স্থাপনাও। দিন যতই গড়াচ্ছে দৃশ্যমান হচ্ছে এসব দখল বেদখলের চিত্র।অভিযোগ উঠেছে, পুলিশি সহযোগিতায় রাতের আঁধারে চলছে দখল-বেদখলের এ প্রতিযোগিতা। জানা যায়, বায়েজিদ লিংক রোডের দুই পাশে প্রভাবশালীরা নানান নামে সাইনবোর্ড তুলছে। আবার সিডিএর বরাদ্দকৃত জায়গাও দখল করছে অনেকে।

সরেজমিনে দেখা গিয়েছে, বর্তমানে এ এলাকার বিভিন্ন পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে শত শত অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। দখলদাররা পাহাড় দখল করে সেখানে আবাসনের ব্যবসাও করছে। টাঙানো হয়েছে দখলদারদের বিভিন্ন সাইনবোর্ড। স্থানীয়রা জানান, নতুন করে পাহাড় দখলের পর সেখানকার মালিকানা দাবি করে এসব সাইনবোর্ড দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড এলাকার বাসিন্দা মো. আরাফাত বলেন, বায়েজিদ লিংক রোডের দুই পাশের পাহাড় এখন দখলকারীদের হাতে। স্থানীয় দখলদাররা বিভিন্ন ছিন্নমূল সংগঠনের নাম দিয়ে এসব পাহাড় দখল করছে। কয়েকদিন আগেও তারা পাহাড়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। দখলের উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছিল। এমনকি আমি যেখানে বসবাস করছি, সেটাও দখল করা পাহাড়। সেখানে মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া দিয়ে আমাদের থাকতে হয়।


শুক্রবার রাতের অন্ধকারে ছলিমপুর এলাকায় চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে স্পেকট্রা ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ভাড়াটে ভূমিদস্যু কর্তৃক ‘ব্লু ভিউ কো-অপারেটিভ সোসাইটির জমি দখল চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে । এসময় ভূমিদস্যুরা সোসাইটির নাইটগার্ড মো. সেলিমকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সোসাইটির সড়ক গুড়িয়ে দেন।ফৌজদার হাট পুলিশ ফাঁড়ির তৌহিদুল করিম এ ব্যাপারে জানান, ‘অভিযোগ আগে থেকে ছিলো দুপক্ষের। কাগজপত্র দেখে বসার কথা। ভাঙ্গচুরের ঘটনাটি সত্য। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবো।’


সিডিএর ঠিদাকারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের দখল বেদখলের শিকার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. ইউসুফ দেশকে বলেন, ‘আমরা বায়েজিদ লিংক রোডের পাশে ৭ কানি জায়গা নিয়েছি। আমাদের পাশে স্পেক্ট্রা ৩ কানি জায়গা নিয়েছে। স্পেক্ট্রার জমির পাশ দিয়ে আমাদের ৩০ ফুটের চলাচলের রাস্তা রয়েছে। চারদিন আগে রাতের বেলা সিকিউরিটির লোকদের বেঁধে রেখে স্পেক্ট্রা বুলডোজার দিয়ে আমাদের সব স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে। ওইসময় পুলিশ নিরব ভূমিকা পালন করেছে। পরে সীতাকুণ্ড থানায় গেলেও দুইদিন বসিয়ে রেখে থানা পুলিশ আমাদের মামলা নেয়নি।’


এ বিষয়ে স্পেক্ট্রা’র প্রকল্প পরিচালক রবিউল হক দেশকে বলেন, ‘আমাদের জায়গার উপর তারা স্থাপনা নির্মাণ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের মুখপাত্র দিদার সাহেবের সাথে কথা বলেন।’


এ বিষয়ে জানতে চাইলে মীরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক নাছির উদ্দিন দিদার দেশকে বলেন, ‘এই প্রকল্প করতে গিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর আমাদের ৫ কোটি টাকা জরিমানা করেছিল। মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন। আমরা ৩৩৩ শতক জায়গা একসাথে কিনেছি। আমরা বাউন্ডারি ওয়াল দিয়েছি। ওখানে বিল্ডিং করেছি। ওখানে এখন একটি গ্রুপ এসে আমাদের জায়গার উপর দিয়ে রাস্তা করে ফেলছে। সেখানে আমাদের লোকজন দিয়ে বাঁধা দিয়েছি। আমরা এখানে অনুমতি নিয়ে পার্ক করার চিন্তাভাবনা করেছি। মীরসরাই আরশিনগর ফিউচার পার্কের মালিক দাবি করেছেন তিনি নিজেকে । তবে নাছির উদ্দিন দিদার সম্বন্ধে ফৌজদার হাট পুলিশ ফাঁড়ির তৌহিদুল করিমকে জিজ্ঞেস করলে তিনি সুকৌশলে প্রশ্নটি এড়িয়ে যান।

সরেজমিনে আরো দেখা গেছে, সিডিএর রাস্তার পাশে নিজেদের সীমানা প্রাচীরের বাইরে রাস্তার লাগোয়া পর্যন্ত সৌন্দয্য বর্ধন কর্মসূচির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে স্টিলের শক্ত ঘেরা দিয়েছে বেঙ্গল ব্রিকস ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। একইভাবে আশেপাশের অনেক পাহাড়ে নতুন করে পোঁতা হয়েছে আরসিসি পিলার। সম্প্রতি এশিয়ান ইউনিভার্সিটির পাহাড় ধস শুরু হওয়ার পর পাহাড়ের পাদদেশে খুঁটি দিয়ে একটি বিরাট জায়গা ঘেরাও করে স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেছে একটি চক্র। আবার সড়কটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রার বিরুদ্ধেও জায়গা দখলের অভিযোগ উঠেছে। আবার জঙ্গল সলিমপুর ও জাফরাবাদ এলাকায় প্রবেশ মুখগুলোর আশেপাশে গত কয়েক মাসের মধ্যে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। কয়েকটি স্পটে অস্থায়ী দোকান নির্মাণ করে কেউ ব্যবসা করছেন। এখানে রাস্তার ধারে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পান সিগারেট ও চায়ের টং দোকান। আবার পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠেছে ডেইরি ফার্মও। স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা রাস্তার ধারে দখল বেদখল কিংবা খুঁটি পোঁতার সব কাজই চলে রাতের আঁধারে। টং দোকানগুলো দখলদারদের সোর্স হিসেবে কাজ করে। দখল হওয়া জায়গায় দিনের বেলা কেউ এলে এসব সোর্সের মাধ্যমে খবর চলে যায় প্রভাবশালী দখলদারদের কাছে।


সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন এসব পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করা ৮৩৫টি পরিবারের তালিকা হয়েছিল সে সময়। সে বছর উচ্ছেদ হয় ৩৫০টি পরিবার। বাকি থাকে আরও ৪৮৫টি। বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কাটে ১৮টি পাহাড়। এসব কাটা পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা সাড়ে তিনশর বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদও করা হয় গত বছর। কিন্তু সেখানে নতুন করে আরও স্থাপনা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, মূলত লিংক রোডের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই রোডের আশেপাশে জায়গা দখল- বেদখলের বিষয়টি বেড়ে যায়। বিভিন্ন পদ্ধতি কাগজপত্র যোগাড় করে দখলকৃত জায়গা ১০ গুন বেশি দামে বিক্রি করার জন্য চেষ্টা করছে। এসব বেদখলের কাজে পুলিশ, দখলদার ও বিভিন্ন তথাকথিত নেতাদের প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষ হাত রয়েছে।

পাহাড়ের অবৈধ বসতিতে সেবা সংস্থার সংযোগ নির্ধারণে গঠিত সাব কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক নুরুল্লাহ নূরী বলেন, এখানে প্রায় ১০ হাজার লোকের বসবাস। সর্বশেষ লকডাউনের সময় ২৪ জুন সেখানে প্রায় ৩৫০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসন। সেদিন পাহাড় দখলমুক্ত করতে গিয়ে অভিযানকারী দলকে বাধা ও হামলার মুখে পড়তে হয়। এ সময় প্রায় ১৬টি পাহাড়ে ব্যক্তিগত জমি, সরকারি খাস জমি ও রেলওয়ের জমি দখল করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা গড়ে তোলার প্রমাণ পায় অভিযানকারী দলটি।

সর্বশেষ - সোশ্যাল মিডিয়া