ঢাকাবুধবার , ৭ জুলাই ২০২১
  1. অন্য আকাশ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন আদালত
  4. আবোল-তাবোল
  5. উদ্যোক্তা
  6. উপসম্পাদকীয়
  7. এক্সক্লুসিভ
  8. কলাম
  9. ক্যারিয়ার
  10. খেলার মাঠ
  11. গ্যাজেট
  12. জাতীয়
  13. টাকা-আনা-পাই
  14. দেশ পরিবার
  15. দেশ ভাবনা

জন্ম নিবন্ধন, নতুন এক ভোগান্তির নাম

বাহাউদ্দিন বাবলু
জুলাই ৭, ২০২১ ৫:০৬ অপরাহ্ণ


পাসপোর্ট, বিবাহ নিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, জমি রেজিস্ট্রেশনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে সব বয়সের জন্ম সনদ প্রয়োজন। তবে নতুন করে জন্ম নিবন্ধন সনদ নিতে অনেককেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সনদ পেতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি শর্ত। এসব শর্ত পূরণ করতে গিয়ে অনেকেরই হাঁসফাঁস অবস্থা, যেন জন্ম নিবন্ধনের আরেক নাম ভোগান্তি।


আগের পুরনো নিয়ম থেকে জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থা নতুন নিয়মে হয়েছে অনলাইনে । আর এই ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা, নতুন কিছু নিয়মের সঙ্গে সার্ভার জনিত সমস্যাও যোগ হয়েছে। ফলে দেশের অনেক স্থানেই জন্ম নিবন্ধন করতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নাগরিকদের।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ায় স্কুলে ভর্তির জন্য সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করাতে গিয়ে আটকা পড়েন অনেক বাবা-মা। এর আগে মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়েই যে কারও জন্ম নিবন্ধন করা যেত। কিন্তু নতুন নিয়মে আগে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন করতে হয়, এরপর পাওয়া যায় সন্তানের জন্ম সনদ।

তবে সিটি কর্পোরেশন বলছে, সবাই যেন জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আসেন সেই জন্য নিবন্ধনের আবেদনে কিছু বিষয় নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, যাদের জন্ম ২০০১ সালের পর তাদের জন্ম নিবন্ধনের জন্য বাবা-মায়ের জন্ম সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করাতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন অনেকে।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কয়েকটি আঞ্চলিক অফিসে গিয়ে নাগরিকদের ভোগান্তির কথা জানা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই সনদ না নিয়ে ফিরে যেতে হয়। অনেকেই আবার অভিযোগ করেছেন মাসের পর মাস ঘুরেও মিলছে না কাঙ্খিত জন্ম সনদ। এ সনদ পেতে ভোগান্তি পেতে হচ্ছে সব শ্রেণীর মানুষের।

এর মধ্যে সন্তানদের স্কুলে ভর্তির জন্য জন্ম নিবন্ধন করাতে গিয়ে বেশি ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে বাবা-মায়েদের।

স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য ছেলের জন্ম নিবন্ধনের জন্য অনেকদিন ধরে ঘুরেও পাচ্ছেন না অ্যাপসভিত্তিক পাঠাও চালক মফিজুল হক। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এক আঞ্চলিক অফিসে গিয়ে ফিরে আসতে হয় তাকে।

মফিজুল হক দেশ’কে বলেন, অনেকদিন ধরেই নিজের কাজ ফেলে ঘুরেছি। এর মধ্যে করোনাও আবার বাড়ছে। স্কুলে বলে কোন রকম ভর্তি করেছি ছেলেকে। আগে আসলে বলতো সার্ভার ডাউন। আবার এদিকে স্কুলে জন্ম নিবন্ধন জমা দিতে হবে। এখান থেকে বলে রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কথা। কিন্তু সেখানে গিয়ে তো নিবন্ধন পাব না। নিবন্ধন নিতে হবে এখানেই।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেল মানিক লাল বনিক (অতিরিক্ত সচিব, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) দেশ’কে বলেন, তার এই ভোগান্তিতে পড়ার কথা নয়। এমন সমস্যার কথা কথা আগে ছিলো। এখন নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন উদ্বর্তন কর্মকর্তা দেশ’কে বলেন, আমার মেয়ের জন্য জন্ম নিবন্ধন করাতে গিয়েছিলাম আরো অনেক মা আগে। সেখানে গিয়ে জানতে পারি স্বামী-স্ত্রী দুজনেরও জন্ম নিবন্ধন করাতে হবে। সেটা করতে গিয়ে তিনি আরেক সমস্যায় পড়েছেন। এখন আমাদেরটা করতে হচ্ছে। জন্ম নিবন্ধনের এই নিয়ম অনেক বেশি ভোগান্তির।

তিনি বলেন, বাচ্চার জন্ম নিবন্ধনের জন্য আমার জন্ম নিবন্ধন চাচ্ছে। আমার জন্ম নিবন্ধনের জন্য যখন আমি আবেদন করতে চাচ্ছি, সেখানে আমার বাবা-মার জন্মনিবন্ধন ও দিতে হবে। আমাদের মতো মানুষের এমন হলে সাধারণ জনগণের তো ভোগান্তির শেষ নেই। এটা আরো সহজভাবে করা যেতো। এখনো তার সন্তানের জন্ম নিবন্ধন পাননি বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল মানিক লাল দেশ’কে বলেন, তার এই ভোগান্তিতে পড়ার কথা নয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ই দেশের নাগরিকদের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছে।

নতুন নিয়ম সম্পর্কে মানিক লাল বনিক বলেন, ২০০১ সাল এবং তার পর থেকে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্ম সনদ পেতে হলে আগে তার মা-বাবার জন্ম নিবন্ধন করতে হবে। আর ২০০১ সালের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের জন্য মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিলেই হয়।

তিনি আরো জানান, নতুন নিয়মে যখন ২০০১ সাল ও তার পরে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয় তাতে মা-বাবার জন্ম নিবন্ধনের নম্বর দিতে হয়। সে কারণে বর্তমানে কোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য বা-বাবার জন্ম নিবন্ধন থাকাটা আবশ্যক।

জানা যায়, সারা দেশে ১২টি সিটি করপোরেশনের ১২৪টি আঞ্চলিক অফিস, ৩২৯টি পৌরসভা, চার হাজার ৫৭৩টি ইউনিয়ন পরিষদ, ১৫টি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এবং ৪৪টি দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ৫৫টি দূতাবাস বা মিশনসহ পাঁচ হাজার ১০৭টি নিবন্ধক অফিসে বর্তমানে সরাসরি ও নিয়মিত যোগাযোগ সমন্বয় করে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের কার্যক্রম চলছে।

জন্ম নিবন্ধনের নতুন এই নিয়ম চালু হওয়ায় ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন এমন আরো অনেকেই।

কথা হয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ধানমন্ডি এলাকার একজন বাসিন্দার সঙ্গে। সম্প্রতি তার স্ত্রী মারা যাওয়ায় মৃত্যু সনদ তুলতে গেলে তাকেও জন্ম নিবন্ধনের সনদ লাগবে বলে জানানো হয়। কিন্তু নতুন জন্ম সনদ না থাকায় মৃত্যু সনদ তুলতে পারছে না।

এদিকে নতুন এই নিয়ম হওয়ায় শিশুদের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে বাবা-মায়ের ভোগান্তির পাশাপাশি প্রাথমিকের সব শিশুকে উপবৃত্তির আওতায় আনা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজবাড়ী জেলার রায়নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আদ্বুল হালিম বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে ১ম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রায় ১৫০ জন। তবে এর বেশির ভাগ শিশুর জন্ম নিবন্ধন নেই।

প্রধান শিক্ষক বলেন, সরকারের উপবৃত্তি পেতে হলে শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। কিন্তু জন্ম নিবন্ধন না থাকায় তারা উপবৃত্তির টাকা পাচ্ছে না। নানা জটিলতায় বাচ্চার বাবা-মায়েরা জন্ম নিবন্ধন করেতেই পারছে না। শুধু তাই নয় বাবা-মায়ের দুজনের জন্ম নিবন্ধন থাকলেও পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। ঈসমাইল হোসেন পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, তাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্ম নিবন্ধন রয়েছে। তবে একজনের ইংরেজিতে অন্যজনেরটা বাংলায় হওয়ার কারণে তারা তাদের সন্তানদের জন্য আবেদনই করতে পারছেন না।

নতুন নিয়ম হওয়ায় এখন জন্ম নিবন্ধন কিভাবে কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের দেশ’কে বলেন, সন্তানের জন্ম নিবন্ধনের জন্য বাবা-মা দুজনের জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। বাবা ও মায়েরটা যদি বাংলায় হয় তাহলে সন্তান বাংলায় একটা জন্ম নিবন্ধন পাবে। আর দুটোই ইংরেজিতে হলে জন্ম নিবন্ধন পাবে ইংরেজিতে।

কিন্তু যদি দুজনেরটা আলাদা হয় তাহলে আবেদনই করতে পারবে না। দুজনেরটা এক ভাষায় করে নিতে হবে। এটা করলে সন্তান জন্ম নিবন্ধন নিতে পারবে। এ ধরনের সমস্যা অনেক হচ্ছে।

নতুন নিয়মে বয়স ভেদে জন্ম নিবন্ধনের জন্য যেসব তথ্য ও নথি লাগবে

সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, শূন্য থেকে ৪৫ দিন বয়সী শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য টিকার কার্ড, পিতা-মাতার অনলাইন জন্মনিবন্ধনসহ জাতীয় পরিচয়পত্র, বাসার হোল্ডিং নম্বর ও চৌকিদারি ট্যাক্সের রশিদের হাল সনদ, আবেদনকারী-অভিভাবকের মোবাইল নম্বর, ফরমের সঙ্গে এক কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি লাগবে।

অপরদিকে ৪৬ দিন থেক ৫ বছর বয়সীদের জন্ম নিবন্ধন নিতে টিকার কার্ড-স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যয়নপত্র স্বাক্ষর ও সিলসহ প্যাডে হতে হবে, পিতা-মাতার অনলাইন জন্মনিবন্ধনসহ জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের প্রত্যয়নসহ বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নের সব প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট লাগবে, বাসার হোল্ডিং নম্বর ও চৌকিদারি ট্যাক্স রশিদের হাল সনদ, আবেদনকারী-অভিভাবকের মোবাইল নম্বর, ফরমের সঙ্গে এক কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

আর বয়স ৫ বছরের বেশি হলে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র (পিএসসি/জেএসসি/এসএসসি) শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র না থাকলে সরকারি হাসপাতালের এমবিবিএস ডাক্তারের স্বাক্ষর ও সিলসহ প্রত্যয়ন সনদ এবং জন্ম নিবন্ধন আবেদন ফরমের ৭ এর ১নং কলামের স্বাক্ষর ও সিল বাধ্যতামূলক। যাদের জন্ম ২০০১ সালের ১ জানুয়ারির পর তাদের ক্ষেত্রে পিতামাতার অনলাইন জন্মনিবন্ধনসহ জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক, যাদের জন্ম ২০০১ সালের ১ জানুয়ারির আগে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক, যদি জন্ম ২০০১ সালের আগে হয় সেক্ষেত্রে পিতা-মাতা মৃত হলে মৃত্যুসনদ বাধ্যতামূলক।

যাদের জন্ম ২০০১ সালের ১ জানুয়ারির পর তাদের পিতা-মাতা মৃত হলে প্রথমে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন গ্রহণ করার পর অনলাইন মৃত্যু নিবন্ধন সনদ গ্রহণ করতে হবে। উভয় সনদ আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে।

সর্বশেষ - জাতীয়