ঢাকাশুক্রবার , ২০ আগস্ট ২০২১
  1. অন্য আকাশ
  2. আইন আদালত
  3. আবোল-তাবোল
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপসম্পাদকীয়
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. কলাম
  8. ক্যারিয়ার
  9. খেলার মাঠ
  10. গ্যাজেট
  11. জাতীয়
  12. টাকা-আনা-পাই
  13. দেশ পরিবার
  14. দেশ ভাবনা
  15. দেশ সাহিত্য

ছয় দফা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু

ড. আবদুল আলীম তালুকদার
আগস্ট ২০, ২০২১ ৪:৩৩ অপরাহ্ণ


ছয় দফা আন্দোলন বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীনতার সনদ ‘ছয় দফা’ কর্মসূচী উপস্থাপন করেন।


এই কর্মসূচী বাস্তবায়নের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক না কেন, কৌশলগত দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফায় পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝের অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ এবং দুই প্রদেশের ফেডারেশনের মাঝে বৈষম্যের সমাধান তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দিকটি প্রাধান্য দেন। তবে রাজনৈতিক স্বাধীনতার লক্ষ্যে স্থির থেকে অর্থনৈতিক দিকটি সামনে নিয়ে আসা তখন একটি কৌশল ছিল মাত্র।


বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ছয়দফা দাবী ঘোষণা করেছিলেন যা বাঙালীর সামনে তাদের স্বাধীনতার দাবী হিসাবে হাজির হয়েছিল এবং তারা এটিকে বেঁচে থাকার অধিকার হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা যে জনগণ এইভাবে একটি দাবীকে (ছয় দফা দাবী) মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছিল এবং এটি বাস্তবায়নের জন্য রক্ত দিয়েছিল; এটি কেবল বাঙালীর পক্ষেই সম্ভব। পাকিস্তানী শাসকদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে ছয়দফা দাবী পর্যায়ক্রমে এক দফা দাবীতে পরিণত হয়েছিল। আর এই ছয় দফার মধ্য দিয়েই বাঙালীর স্বাধীকার আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করে।


১৯৬৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের লাহোরে পৌঁছান এবং তার পরদিন অর্থাৎ ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে বিরোধী দলের সম্মেলন শুরু হয় এবং এই সভায় বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দাবি পেশ করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসাবে চিত্রিত করা হয়। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয়দফা প্রস্তাব এবং দাবী আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচী সংগৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমদের ভূমিকা সংবলিত ছয় দফা কর্মসূচীর একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। যার নাম ছিল ‘ছয় দফা : আমাদের বাঁচার দাবী’। ২৩ ফেব্রুয়ারী শেখ মুজিব বিরোধীদলীয় সম্মেলনে ছয়দফা পেশ করেন। এরপর ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর নামে ‘আমাদের বাঁচার দাবী’: ৬-দফা কর্মসূচী’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রচার করা হয়। ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ছয় দফা উত্থাপন করা হয় লাহোর প্রস্তাবের সাথে মিল রেখে। ছয় দফা দাবীর মূল উদ্দেশ্য- পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র, ছয় দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে এই ফেডারেল রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। পরবর্তীকালে এই ৬ দফা দাবীকে কেন্দ্র করে বাঙালী জাতির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার হয়। এরপর থেকেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আপোসহীন সংগ্রামের ধারায় ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের দিকে এগিয়ে যায় পরাধীন বাঙালী জাতি। পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক ছয় দফাভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনই ধাপে ধাপে বাঙালীর স্বাধীনতার সংগ্রামে পরিণত হয়। বাংলাদেশের জন্য এই আন্দোলন এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে একে ম্যাগনাকার্টা বা বাঙালী জাতির মুক্তির সনদও বলা হয়ে থাকে।


প্রতি বছর বাংলাদেশে ৭ জুন ‘৬ দফা দিবস’ পালন করা হয়। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬ দফা দাবীর পক্ষে দেশব্যাপী তীব্র গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়। এই দিনে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হক, মুজিবুল হকসহ মোট ১১ জন বাঙালী শহীদ হন। ৬ দফা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ছিলেন সিলেটের মনু মিয়া।


ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশ রাজত্ব শেষে পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনসংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এবং পাকিস্তানের মোট রপ্তানী আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ রপ্তানী (যেমন পাট) হতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে। তবে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা আনুপাতিক ছিল না। বছরের পর বছর পূর্ব পাকিস্তান আঞ্চলিক ভিত্তিতে ক্রমাগত বৈষম্যের শিকার হওয়ার গুরুতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এর ফলে, অর্থনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি এবং পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা বৈষম্য সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন শুরু করে এবং ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রদান করে। রেহমান সোবহান, নূরুল ইসলাম প্রমুখ বুদ্ধিজীবি ছয় দফার খসড়া প্রণয়ন করেন।


১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবীসমূহ হলো:
প্রস্তাব-১: শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশনে পরিণত করতে হবে, যেখানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে এবং প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত আইন পরিষদ সার্বভৌম হবে।
প্রস্তাব-২: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে যথা: দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।
প্রস্তাব-৩: মুদ্রা বা অর্থ-সম্বন্ধীয় ক্ষমতা: মুদ্রার ব্যাপারে নিন্মলিখিত দু’টির যে কোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারে:-
(ক) সমগ্র দেশের জন্য দু’টি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে। অথবা,
(খ) বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্যে কেবলমাত্র একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসূ ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব-পাকিস্তানের জন্যে পৃথক আর্থিক বা অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।
প্রস্তাব-৪: রাজস্ব, কর বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা: ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্যগুলির কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনোরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গ-রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলির সবরকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।
প্রস্তাব-৫: বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা:
(ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।
(খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলির এখতিয়ারাধীন থাকবে।
(গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোনো হারে অঙ্গরাষ্টগুলিই মিটাবে।
(ঘ) অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা করজাতীয় কোনো রকম বাধা-নিষেধ থাকবে না।
(ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং স্ব-স্বার্থে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।


প্রস্তাব-৬: আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা: আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা-সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।
ছয় দফা কর্মসূচির দু’টি স্বতন্ত্র দিক রয়েছে। একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কিত, অন্যটি অর্থনেতিক। তবে একটি অপরটিকে ছাড়া অর্থহীন তথা পরিপূরক, যেখানে অর্থনৈতিক বিষয়টি ছিল একরকম গৌণই। আর রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনই ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্য।
ঐতিহাসিক ছয় দফার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যদি আমরা পর্যালোচনা করি তাহলে স্পষ্টই ফুটে ওঠে বাঙালীদের সাথে পাকিস্তানী শাসকদের কি রকম বিমাতাসুলভ আচরণ ছিল। পাকিস্তানী শাসকদের প্রথম আঘাত বাঙালিদের মাতৃভাষা বাংলাকে কেড়ে নিয়ে তারা এদেশের ভাষা উর্দু বানাতে চেয়েছিল। বাংলা অক্ষরকে আরবী/উর্দু অক্ষরে লেখার প্রচলন করার অপচেষ্টা করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর কোনো শক্তিশালী ঘাঁটি কখনো গড়ে তোলা হয়নি এমনকি এদেশের কোনো নাগরিককে সশস্ত্র বাহিনীর কোনো উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। পূর্ববঙ্গের উপার্জিত অর্থ কেড়ে নিয়ে তারা গড়ে তোলে পশ্চিম পাকিস্তান। বাঙালীদের ওপর অত্যাচার করাই ছিল শাসকদের একমাত্র কাজ। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলেও শাসকগোষ্ঠী অন্যায়ভাবে সে নির্বাচন বাতিল করে দেয়।


১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় এ অঞ্চলের জনগণ সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। সবক্ষেত্রে বিশেষত বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর চাকুরীতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ছিল চরম পর্যায়ে। রাজস্বের সিংহভাগই পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। বঙ্গবন্ধু এই বিরাট বৈষম্য ও শোষণ-বঞ্চনার ইস্যুটি তুলে ধরেন। এতোসব নানা কারণেই বঙ্গবন্ধু দূরদর্শিতার সঙ্গে ছয় দফা দাবি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেন এবং এসব বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যান। আর তাঁর সংগ্রামের পথ ধরেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি।

লেখক : সহ. অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।

সর্বশেষ - সোশ্যাল মিডিয়া

আপনার জন্য নির্বাচিত