ঢাকারবিবার , ২২ আগস্ট ২০২১
  1. অন্য আকাশ
  2. আইন আদালত
  3. আবোল-তাবোল
  4. উদ্যোক্তা
  5. উপসম্পাদকীয়
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. কলাম
  8. ক্যারিয়ার
  9. খেলার মাঠ
  10. গ্যাজেট
  11. জাতীয়
  12. টাকা-আনা-পাই
  13. দেশ পরিবার
  14. দেশ ভাবনা
  15. দেশ সাহিত্য

চুল নিয়ে সম্ভাবনা, শিল্প স্বপ্নহীন

মোঃ আবু আস-সাদিক, দামুড়হুদা প্রতিনিধি
আগস্ট ২২, ২০২১ ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

দামুড়হুদায় ফেলে দেয়া চুল থেকে ব্যবসাটা শুরু হয়েছে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। শুরুর পর থেকে এতটা সময় পেরিয়ে গেলেও ব্যাবসাটা যেন শুধু হাত বদলেই সীমাবদ্ধ। চুল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ করতেই যে ব্যবসার সৃষ্টি তা এখনও সেই অবস্থানেই রয়ে গেছে।

কিছু মানুষের হয়ত কর্মসংস্থান হয়েছে কিন্তু চরম সম্ভাবনা থাকলেও স্বপ্নের অভাবে শীল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি মানুষের মাথার ফেলে দেয়া এই চুল ও সেই চুল প্রসেসিং মাধ্যমটি।

জানা গেছে,চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে এক দশক পূর্বে নারীদের ফেলে দেয়া মাথার চুল সংগ্রহ করে ভারতে পাচার করা শুরু করে কিছু যুবক। সেসময় হঠাৎই তাদের কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগে এই চুল কিনে তারা আসলে কি করে। পরে খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পারে ভারত এই চুল চীনের কাছে বিক্রি করে। সেই থেকেই চুল এই অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি পণ্য হয়ে ওঠে আর শুরু হয় সেই পণ্যের বেঁচা-কেনা। সৃষ্টি হয় স্থানীয় বাজার।

এ সময়ই চীনের বায়াররা ঢাকায় এসে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে চুল কেনা শুরু করে। প্রথমে লুকিয়ে চুল বিক্রি করা হলেও ২০০৯ সালে কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রকাশ্যেই ফেলে দেয়া চুল বেঁচা কেনা শুরু হয়। শুরুর দিকে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিলো চুল বেঁচা- কেনার ক্ষেত্রে। কারন ওই সময় পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই চুল জব্দ করতো অবৈধ পন্য হিসেবে। তাই তখন স্থানীয় এসকল চুল ব্যাবসায়ীরা বেশ গোপনেই এই চুল নিয়ে যেতেন ঢাকায়। বাইরের বাজারে চুলের কদর থাকার কারনে সেসময় বেশ জনপ্রিয়তা পাই এই ব্যাবসা ফলে দিনে দিনে প্রসার বাড়তে থাকে চুলের ব্যাবসার। অবশেষে ২০১২ সালে এখানকার চুল ব্যবসায়ীরা ‘‘একতা হেয়ার প্রসেসিং ব্যাবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড’’ নামে একটি সংগঠন তৈরী করে সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত হয়। ওই সমিতির কল্যানে চুল পায় পণ্য হিসেবে সীকৃতি। সেই থেকে এখানকার চুল ব্যাবসায়ীরা উক্ত সমিতির মাধ্যমে বৈধভাবে প্রকাশ্যে চুলের ব্যাবসা করা শুরু করে।

বর্তমানে উক্ত সমিতির মাধ্যমে প্রায় এক লক্ষ হকার সারা দেশে মানুষের মাথার ফেলে দেয়া চুল সংগ্রহ করছে। আর তা বিক্রি করছে দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নসহ অন্যান্য ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বর্তমানে প্রায় হাজারেরও বেশি চুল প্রক্রিয়াকরন ছোট বড় কারখানায়। পরবর্তিতে প্রক্রিয়াকরনের মাধ্যমে তা আবার বিক্রির জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। চুল পণ্য হিসেবে সীকৃতি পাবার পর থেকে এতগুলো বছর ধরে এই একই ধাপে চুলের ব্যাবসাটা চলমান রয়েছে। প্রথমে বাড়ী বাড়ী যেয়ে হকাররা চুল কিনে আনছেন। হকারদের কাছ থেকে চুল প্রক্রিয়াকরন কারখানার চুল ব্যাবসায়ীরা ওই চুল কিনছেন। পরবর্তিতে সেই চুলগুলো প্রক্রিয়াকরন করে গ্রেডিং করে আবার চীনের বায়ারদের কাছে বিক্রি করছেন স্থানীয় এই চুল ব্যবসায়ীরা। আর এই প্রক্রিয়াকরনকাজে সীমান্তবর্তী এসকল এলাকার কয়েক হাজার নারী কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন এই প্রক্রিয়াকরন কারখানাগুলোতে। তাতে বেশ কিছু পরিবার আসলেই সচ্ছলতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছে। তবে এই ব্যাবসার যে প্রসার এবং বর্হিঃবিশ্বে এই চুলের যে চাহিদা তাতে এর থেকে আরো অনেক বেশি মানুষের রুটি রুজির মাধ্যম হতে পারতো। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো চুল প্রসেসিং বিষয়ে মানুষের তেমন কোন ধারনা না থাকার কারনে এবং সরকারীভাবে এর ওপর কোন প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা না থাকায় একদিকে যেমন দক্ষ শ্রমিক সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছেনা তেমনই ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা স্বত্তেও শীল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে ব্যার্থ হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন চুয়াডাঙ্গা জেলার উপ ব্যাবস্থাপক (ভাঃ) মোঃ সামসুজ্জামান দৈনিক দেশকে বলেন, চুল এ অঞ্চলে একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পণ্য। কিন্তু সরকারীভাবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতায় না থাকার কারনে আমরা এ বিষয়ে তেমন কোন সহোযোগীতা করতে পারছিনা। যদিও বর্তমানে প্রতিদিন এই চুল বেঁচা-কেনার মাধ্যমে এ জেলায় প্রায় কোটি টাকার মত ব্যবসার কথা আমরা শুনেছি তবুও এ বিষয়ে আমাদের কাছে তেমন কেউ সাহায্যের জন্য না আসার কারনে আমরা বিষয়টি নিয়ে কখনও ভেবে দেখিনি বা এ বিষয়ে কোন কার্যক্রমও শুরু করতে পারিনি।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে একতা হেয়ার প্রসেসিং ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা সহিদ বিশ্বাস জানান, শুরুতে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হলেও এখন তা কমে এসেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন জানে, এ ব্যবসা অবৈধ নয়। তিনি বলেন,বর্তমানে চুলের বাজার অনেক ভালো। চুলের দামও আগের থেকে অনেক বেশি। এখন হকাররা যে গুটি কিনে নিয়ে আসে তাই বিক্রি হয় কেজি প্রতি ১১হাজার টাকা করে। আর প্রসেসিং করা চুল গ্রেড অনুযায়ী কেজি প্রতি ১৬হাজার টাকা থেকে ৪৫হাজার টাকা পর্যন্ত বায়াররা কিনে থাকে। এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকার চুল ঢাকায় যায়।
তিনি আরো জানান,আমরা যে চুল বিক্রি করি তা চীন কিনে নিয়ে আবার অন্য দেশের কাছে বিক্রি করে। তাই বলা যায় আমরা শুধু এখানে হাত বদলের ব্যাবসা করছি। মূল বাজারের সাথে আমরা এখনও সংযুক্ত হতে পারিনি। যদিও চীনা বায়ারদের কাছে আমাদের দেশের চুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
তাই ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চুল এখনও এদেশে শীল্প হয়ে ওঠেনি। চুলকে শীল্প হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যেমন প্রয়োজন দক্ষ জনবল তেমনি সঠিক পরিকল্পনা। সত্যিকার অর্থে এই চুলের ব্যবসার সাথে জড়িত মানুষগুলো খুব বেশি শিক্ষিত না হওয়াটাও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকটাই দ্বায়ী।


রিসার্চ এন্ড এক্সপারটাইজ অব ওয়াল্ড ইকোনমির দেওয়া তথ্য মতে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে পৃথিবীতে মানুষের মাথার চুলের ব্যাবসার পরিমান ছিলে ১শ ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় ৯শত৫১ কোটি ৭৮ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা। আর এই চুল রপ্তানীকারক হিসেবে নাম ছিলো হংকং,ভারত,মায়ানমার,সিংগাপুর এবং চীনের। অথচ এই চীনের বায়াররাই চুল কিনে থাকে বাংলাদেশের কাছ থেকে। কিন্তু দূর্ভাগ্য হলেও সত্য বাংলাদেশ যে চুল প্রক্রিয়াকরন করে বিক্রি করছে সে বিষয়ে কোন তথ্যই দিতে পারেনি ওই পরিসংখ্যান। চুল যে শুধু প্রক্রিয়াকরনের মাধ্যমে বিক্রি হয় তা কিন্তু নয়। চুল থেকে তৈরী চুলের ক্যাপ,খোপার রয়েছে ব্যপক চাহিদা।


তবে আশার কথা হচ্ছে বর্তমানে সীমান্তবর্তী কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নেই প্রক্রিয়াকরন চুল থেকে চুলের ক্যাপ তৈরীর কারখানাও গড়ে উঠছে। তাই সরকারীভাবে সহোযোগিতা করা হলে অচিরেই চুল একটি রপ্তানীযোগ্য অন্যতম পণ্যে পরিণত হবে।

সর্বশেষ - সোশ্যাল মিডিয়া