ঢাকাসোমবার , ৫ জুলাই ২০২১
  1. অন্য আকাশ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন আদালত
  4. আবোল-তাবোল
  5. উদ্যোক্তা
  6. উপসম্পাদকীয়
  7. এক্সক্লুসিভ
  8. কলাম
  9. ক্যারিয়ার
  10. খেলার মাঠ
  11. গ্যাজেট
  12. জাতীয়
  13. টাকা-আনা-পাই
  14. দেশ পরিবার
  15. দেশ ভাবনা
পাইকগাছা লোনাপানি গবেষনা কেন্দ্রের সফলতা

চিত্রা মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন

সুনীল কুমার দাস, ব্যুরো প্রধান (খুলনা)
জুলাই ৫, ২০২১ ১২:৫৩ অপরাহ্ণ


দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিলুপ্তপ্রায় চিত্রা মাছের কৃত্রিম প্রজনন এবং পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে খুলনার পাইকগাছা লোনাপানি গবেষনা কেন্দ্রের মৎস্য বিজ্ঞানীরা।


 

গত কয়েক মাস ধরে গবেষনা কেন্দ্রে মা মাছ (মাদার ফিস) প্রতিপালন করে মে-জুন মাসে কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনে এই সফলতা এসেছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাইকগাছা লোনাপানি গবেষনা কেন্দ্রের মৎস্যবিজ্ঞানীদের তিন সদস্যের টিম এ গবেষনা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। গবেষক দলের নেতৃত্ব দেন লোনাপানি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান ড. মোঃ লতিফুল ইসলাম এবং তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন গবেষক শাওন আহম্মেদ ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ওয়াসীম। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষনায় মিঠা পানির বিলুপ্তপ্রায় মাছ পুন:উদ্ধার ও সংরক্ষণের পর এবার লোনাপানির চিত্রা মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদনে সফলতায় উপকুলীয় এলাকার মাছ চাষীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

 

 

পাইকগাছা লোনাপানি গবেষনা কেন্দ্র সূত্র জানায়, চিত্রা মাছ উপকূলীয় অঞ্চলভেদে পায়রা, বিশতারা, বোথরাসহ একাধিক নামে পরিচিত। মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Scatophagus argus। উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন মাছের মধ্যে চিত্রা একটি। মাছটি দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমনি খেতেও সুস্বাদু। এক সময় চিত্রা মাছ সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার নদ-নদী, খাল ও ঘেরে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। পরিবেশ বিপর্যয় ও সংরক্ষণের অভাবে এ মাছটি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে বলে আশংকার কথা জানিয়েছে বিশ্ব প্রানী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা(IUCN Bangladesh, 2000)।এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে গবেষনা কেন্দ্রের মৎস্য বিজ্ঞানীরা চিত্রা মাছের পুকুরে ফলপ্রসু উৎপাদনে গবেষনার উদ্যোগ নেয়। গবেষণার জন্য চার বছর আগে খুলনার শিবসা নদী এবং সুন্দরবন সংলগ্ন খাল থেকে বেশকিছু চিত্রা মাছের পোনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে গবেষনা কেন্দ্রের আবদ্ধ পুকুরে প্রচলিত ভাসমান খাবারে অভ্যস্তকরণের মাধ্যমে প্রজননক্ষম মাছে পরিণত করা হয়।

 

 

গবেষক দলের সদস্য শাওন আহম্মেদ জানান, চিত্রা মাছ দৈর্ঘ্যে সাধারণত ৩৫ সে.মি. এবং সর্বোচ্চ ওজন ১.৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। একই বয়সী পুরুষ মাছ স্ত্রী মাছ অপেক্ষা আকারে ছোট হয়ে থাকে।নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জীবনকালের দ্বিতীয় বছরে কিছু মাছ প্রজননক্ষম হলেও তৃতীয় বর্ষে অধিকাংশ প্রায় ৮০শতাংশ মাছ প্রজননে সক্ষম হয়। এ সময় পুরুষ মাছের সর্বনিন্ম ওজন ৮০ গ্রাম এবং স্ত্রী মাছের ওজন ১৮০ গ্রাম হয়ে থাকে। একটি প্রজননক্ষম চিত্রা মাছ প্রতিগ্রাম দেহ ওজন অনুসারে ২,০০০-২,৫০০টি ডিম ধারণ করে থাকে।

 

 

গবেষকদলের সদস্য উর্দ্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ওয়াসীম জানান, চিত্রা মাছ স্বভাবে সর্বভুক এবং এর প্রজনন মৌসুম এপ্রিল-জুলাই মাস পর্যন্ত। পরিপক্ক মাছকে হ্যাচারিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হরমোন প্রয়োগ করে প্রজননে উদ্দীপ্ত করা হয়। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাস থেকেই প্রজননের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু এ বছর অতি খরাজনিত কারণে মাছের পরিপক্কতা আসতে বিলম্ব হয়। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালানোর পর কাঙ্খিত সফলতা পাওয়া গেছে।

 

 

গবেষক দলের প্রধান মৎস্যবিজ্ঞানী ড. মোঃ লতিফুল ইসলাম বলেন, গত চার বছর যাবৎ মাছটির কৃত্রিম প্রজনন নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। প্রজননক্ষম মাছ উৎপাদন, প্রজনন মৌসুম নির্ধারণ, প্রজননের জন্য উপযুক্ত লবণাক্ততা, উপযুক্ত হরমোন নির্বাচন ও ডোজসহ বিভিন্ন বিষয় নিরুপণ করা হয়। পরে ধারাবাহিক প্রষ্টোতে চিত্রা মাছের পোনা উৎপাদনে সফলতা এসেছে। তিনি আরও বলেন, হ্যাচারিতে এখন সর্বমোট পাঁচ ব্যাচের পোনা রয়েছে। প্রথম ব্যাচের উৎপাদিত পোনার বয়স এখন ৩৪ দিন এবং সর্বশেষ ব্যাচের রেণুর বয়স ০৫দিন। উৎপাদিত রেণুগুলিকে প্রাথমিকভাবে গ্রীনএ্যালজি এবং রটিফার জাতীয় খাবার দিয়ে বড় করা হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে আর্টেমিয়া ও অন্যান্য রেডি ফিড প্রয়োগ করা হচ্ছে। ড. লতিফুল ইসলাম বলেন, স্বাদু পানির মাছের কৃত্রিম প্রজননের তুলনায় লোনা পানির মাছের কৃত্রিম প্রজনন কষ্টসাধ্য বিষয়। লোনা পানির মাছের প্রজননে পরিবেশিক ও পারিপার্শ্বিক অনেকগুলো নিয়ামক বিবেচনায় নিতে হয়। এছাড়া রেণুর প্রাথমিক খাদ্য হিসাবে লাইভ ফিড প্রয়োজন হয় যা উৎপাদন কষ্টসাধ্য।তবে সবকিছুই সফলতার সাথেই সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। এখন এটি বানিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে পারলেই গবেষনা সার্থক ও জনহিতকর হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

 

 

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, বিলুপ্ত প্রায় চিত্রা মাছের প্রজনন সফলতা ইনস্টিটিউটের জন্য গর্বের। আমাদের বিজ্ঞানীরা নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে এ সফলতা অর্জন করেছে। এক সময় চিত্রা মাছ প্রচুর পরিমানে পাওয়া গেলেও এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। চিত্রা মাছ সর্বভূক হওয়ায় উপকূলীয় ঘেরে অন্যান্য মাছের সাথেও চাষ করা যাবে। তিনি আরও জানান, অ্যাকোরিয়ামে ব্যবহারের জন্য চিত্রা মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সুস্বাদু চিত্রা মাছের কৃত্রিম প্রজনন কৌশল উদ্ভাবিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে এর পোনা উৎপাদন, প্রাপ্যতা ও চাষের প্রসার ঘটবে। চিত্রা মাছের প্রজনন সাফল্য বাংলাদেশকে মেরিকালচার তথা ব্লু-ইকোনোমির উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।মিঠাপানির দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: আবু সাইদ জানান, এক সময়ে চিত্রামাছ দেশী মাছের মতই সবখানেই পাওয়া যেত। এখন সেটা দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে।গবেষকরা এ প্রজাতির মাছের প্রজননে সফলতা পেয়েছে এটা অবশ্যই সুখবর আমাদের জন্য। তারা মাছ উৎপাদনে ও কোয়ালিটিতে সফলতা পেলেই কেবলমাত্র চাষী পর্যায়ে সম্প্রসারন করা সমুচিত।তবে চিত্রা মাছের উৎপাদন, চাষ প্রক্রিয়া ও কোয়ালিটি সবকিছুই ভারো হরে সেটা পর্যবেক্ষন করে চাষী পর্যায়ে সম্প্রসারণের জন্য সরকারের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।অনুমোদন পাওয়া গেলে মৎস্য বিভাগ ব্যাপকবিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে চাষের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এটা সফল হলে দেমের মাছের উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও বিশেষ ভুমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করেন।

সর্বশেষ - জাতীয়